আজ শনিবার,২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং,৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, সময়: রাত ৪:২১
  • মাঝ বয়সী নারীদের প্রতি যুবকরা কেন আকৃষ্ট হয়?
  • বিয়ের আগে যেসব পরীক্ষা করা জরুরী
  • বেনাপোল ঘিবা সীমান্তে পিস্তল,গুলি, ম্যাগাজিন ও গাঁজাসহ আটক-১
  • টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে মানব বন্ধনের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
  • বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন ঠাকুরগাঁও পৌরসভা
  • সরে দাঁড়িয়েছেন বুবলী, শাকিবের চাই নতুন নায়িকা!
  • ফিচার লেখক সম্মেলন ২০১৮ সম্পন্ন

সন্দেহভাজনের তালিকায় ক্রিসেন্ট গ্রুপ

ডেস্ক রির্পোট: ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার রফতানি আদেশের স্বীকৃতিপত্র কিনেছিল জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির পুরান ঢাকায় ইমামগঞ্জ শাখার মাধ্যমে কেনা রফতানি বিলের অর্থ অনেক আগেই তুলে নিয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন এবং রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট গ্রুপ। রফতানির বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া শতকোটি টাকার নগদ প্রণোদনাও তুলে নিয়েছে গ্রুপটি।

এরপর এক বছরেও স্বীকৃতিপত্রের বিপরীতে অর্থ ফেরত আসেনি জনতা ব্যাংকে। গত কয়েক মাসে বহু চেষ্টা করে মাত্র ১৩৪ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকটি। বাকি ৯৬৬ কোটি টাকার কোনো হদিস মিলছে না। গুণগত মান বিচারে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণটি এরই মধ্যে সন্দেহজনক মানে খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপকে যে পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে, সে পরিমাণ পণ্য রফতানির সক্ষমতা তাদের নেই। গ্রুপটির রফতানি আদেশ ক্রয়ের ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংক বেশি উদারতা দেখিয়েছে। রফতানির আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহও করছেন তারা।

গ্রুপটির এত বড় রফতানির সক্ষমতা আছে কিনা তা অনুসন্ধানে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয় ঢাকার হাজারীবাগ ও সাভারের হেমায়েতপুর চামড়া শিল্পনগরীতে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা। পুরান ঢাকার হাজারীবাগ থানাসংলগ্ন ক্রিসেন্ট ট্যানারিতে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা একটি পুরনো ভবনে চামড়া শুকানোর কাজ চলছে। ভবনটির ফটকের সামনে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা- ‘এই সম্পত্তি এবং মালামাল জনতা ব্যাংক লিমিটেড ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ।’ ঠিক একই চিত্র দেখা যায় হেমায়েতপুর চামড়া শিল্পনগরীতেও। সেখানে ক্রিসেন্ট গ্রুপের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় ভবন তৈরির কাজ চলছে। তিনতলা এ ভবনের কাজ এখন পর্যন্ত শেষ হয়েছে ৪০ শতাংশ। এ অবস্থায়ই ট্রাকে করে আনা প্রক্রিয়াজাত কাঁচা চামড়া শুকানোর জন্য ঝুলানো হচ্ছে। ওই ভবনের নিরাপত্তাপ্রহরীরা জানান, এখনো সেখানে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়নি। হাজারীবাগ ট্যানারিতে প্রক্রিয়াজাত করা কাঁচা চামড়া সেখানে নিয়ে শুকানো হয়। যে কক্ষগুলো এখন পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছে, চামড়া রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো।

আরও পড়ুন:সেবা না থাকলেও প্রচার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্রিসেন্ট গ্রুপের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত একটি চারতলা ভবন। ওই ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ক্রিসেন্ট গ্রুপের সবক’টি ভবন, মালামাল ও সম্পত্তিতেই জনতা ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ লেখা সাইনবোর্ড টানানো।

চামড়া শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা জানান, মূলত জনতা ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া টাকায় জমি ও ট্যানারি কিনেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট যে পরিমাণ ঋণ পেয়েছে, গ্রুপটির সব সম্পত্তি বিক্রি করেও তা পরিশোধ হবে না।

বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার কথা হয় ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, রফতানি বিল ব্যাংকে জমা হওয়া ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গত বৃহস্পতিবারও কিছু টাকা দেশে এসেছে। এ সপ্তাহে আরো কিছু জমা হবে।

রফতানি আয় না আসার ক্ষেত্রে সমস্যা কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের সময় তিন-চার মাস সমস্যা ছিল। এ কারণে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। আমি বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা দ্রুতই টাকা পাঠিয়ে দেবে।

কারখানা স্থানান্তরের সঙ্গে রফতানি আয় না আসার সম্পর্ক কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ব্যবসার পরিস্থিতি সবসময় এক রকম থাকে না। যেকোনো কারণেই টাকা পরিশোধে বিলম্ব হতে পারে। যেসব ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠানো হয়েছে, তারা আমাদের পুরনো কাস্টমার। এজন্য কোনো সমস্যা হবে না। ক্রিসেন্ট গ্রুপের রফতানির বিপরীতে অর্থ দেশে না আসার বিষয়টি নিয়ে গত ডিসেম্বরেই অনুসন্ধান শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা
পরিদর্শন বিভাগ। অনুসন্ধানে ঋণ বিতরণে অস্বচ্ছতার বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর ঋণটি নিয়ে বিশদ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-২’। ওই পরিদর্শনের আলোকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণটি সন্দেহজনক (ডিএফ) মানে খেলাপি করার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হলে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি জনতা ব্যাংকের পর্ষদও ঋণটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। জনতা ব্যাংকের নিজস্ব একটি কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। এসবের ফলে ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছে ঋণের পুরো অর্থই ফেরত আসবে বলে মনে করেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপ আমাদের দীর্ঘদিনের গ্রাহক। এর আগে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন স্বচ্ছ ছিল। তবে রফতানি বিল আটকে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ঋণটি সন্দেহজনক মানে খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নিয়েছি। জনতা ব্যাংকের পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। আশা করছি, ঋণের পুরো অর্থই ফেরত আসবে।

এরই মধ্যে গ্রুপটি ১৫০ কোটি টাকার মতো পরিশোধ করেছে জানিয়ে জনতা ব্যাংক এমডি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরো ৫০ কোটি টাকা পরিশোধের কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত গ্রুপটির কাছে জনতা ব্যাংকের ৯৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি পাওনা রয়েছে।

১৯৭৭ সাল থেকে ট্যানারির মাধ্যমে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত ক্রিসেন্ট ট্যানারি। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত এ ব্যবসার হাল ধরেছেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা এমএ কাদের। দীর্ঘদিন কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত এ ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক উত্থান শুরু হয় ২০১২ সালে। সে সময় থেকে এমএ কাদেরকে উদারহস্তে ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এ ধারা অব্যাহত ছিল ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

ব্যাংকটির পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার সবচেয়ে বড় গ্রাহক এমএ কাদের। মূলত ওই শাখার ৭০ শতাংশ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডই ক্রিসেন্ট গ্রুপ ঘিরে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শাখাটিতে গ্রাহকদের আমানত ছিল ৯৬ কোটি টাকা। একই সময়ে শাখাটি ২ হাজার ৮১০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। বিতরণকৃত এ ঋণের প্রায় অর্ধেকই গেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছে।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের বিষয়ে খোঁজ নিতে গতকাল শাখাটিতে গেলেও কোনো কর্মকর্তাই এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। শাখাটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) একেএম আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আমি সম্প্রতি শাখাটির দায়িত্ব নিয়েছি। ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের বিষয়ে এখনো খুব বেশি জানা হয়নি।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। এরপর ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। এ দুই চেয়ারম্যানের মেয়াদেই মূলত জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত তিন বছর জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মো. আবদুস সালাম। ক্রিসেন্ট গ্রুপের সবচেয়ে বেশি স্বীকৃতিপত্র কেনা হয়েছে এ সময়ের মধ্যে। রফতানি আদেশ অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট গ্রুপের রফতানির অর্থ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জনতা ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু সে টাকা এখনো আসছে না ব্যাংকে।

ওই সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, পণ্য রফতানির স্বীকৃতিপত্র কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোনো ভূমিকা থাকে না। এক্ষেত্রে পর্ষদের অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয় না। এ কারণে ক্রিসেন্টের স্বীকৃতিপত্র কেনার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখে।

সূত্র-বণিক বার্তা


samakalnews24.com এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

অর্থনীতি-ব্যবসা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ