১৬ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
যশোরের শার্শা-বেনাপোলে ৪ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে জ’রিমানা বগুড়ায় বালু উত্তোলন নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ সাংবাদিক সজল চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা; প্রতিবাদ ও... চাঁদপুরে পেঁয়াজের দোকানে অভিযান; ৪ দোকান মালিককে... ফুলবাড়ীতে প্রতিকেজি পেয়াজ ২৬০ টাকা,কাচাঁ বাজারেও আগুন

অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবা’সন

  সমকালনিউজ২৪

অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকালু বুধবার ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠানোর জন্য যে তালিকা করা হয়েছিল ঐ তালিকার মাত্র ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের কাছে সাাৎকার দেন।

কক্সবাজারে অবস্থানকারী ১১ লাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমারের ছাড়পত্র পাওয়া তিন হাজার ৫৪০ জনের অনেকেই রাখাইন রাজ্যে ফিরতে রাজি হননি। তালিকাভুক্তদের মধ্যে মাত্র ২১ জন মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এবং বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধিদের কাছে তাদের মতামত জানিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টেকনাফের শালবাগান রো’হিঙ্গা শিবিরে নির্ধারিত স্থানে রোহিঙ্গা’দের পরিবারভিত্তিক মতামত যাচাই বা সাাৎকার নেয়ার প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে ১০-১৫ জন রোহিঙ্গা সাাৎকারে আসলেও তারা মিয়ানমার ফেরৎ যাওয়ার অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবারের প্রত্যাবা’সন প্রক্রিয়াও।

সূত্রমতে, বরাবরের মতোই এবারও কিছু এনজিও সংস্থা রোহি’ঙ্গা প্রত্যা’বাসন বানচাল করতে কাজ করেছে। যে কারণে মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনে সম্মতি প্রকাশ করার পরও বেশিরভাগ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরৎ যেতে সাাৎকারে হাজির হয়নি। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম জানান, প্রত্যাবাসনের জন্য তিন হাজার ৪৫০ জন রোহি’ঙ্গাকে মিয়ানমার কিয়ারেন্স দিয়েছে। এদের ৯০ ভাগ বসবাস করেন টেকনাফের ২৬ ন¤¦র ক্যাম্পে। এছাড়া বাকিরা থাকেন ২৭ ও ২৪ ন¤¦র ক্যাম্পে। এদের মধ্যে অল্পসংখ্যক রোহি’ঙ্গা আছেন নয়াপাড়া রেজি’স্টার্ড ক্যাম্পে। সবকটি ক্যাম্প কাছাকাছি হওয়ায় যাতায়াতের সুবি’ধার্থে ২৭ নম্বর ক্যাম্পের সিআইসি কার্যালয়ের পাশেই সাাৎকার নেয়ার স্থান ঠিক করা হয়েছিল।

ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র জোসেফ সূর্য ত্রিপুরাও বেনারকে বলেন, এ বিষয়ে আজ কিছুই জানানো হবে না। এদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা’দের ওপর নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহে মিয়ানমারে গঠিত ‘ইন্ডিপেনডেন্ট কমিশন অফ ইনকোয়ারির’ অগ্রবর্তী একটি দল গতকাল কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীর শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেছে। তারা কুতুপালং এবং বালুখালীর বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শনের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন।

এর আগে সোমবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছে দুপুরে আরআরআরসি এবং সন্ধ্যায় ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন দলটির সদস্যরা।

টেকনাফের জাদিমুড়া শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গা নারী-পুরুদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সাাৎকার দিতে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তবে মাত্র কয়েকজন সাাৎকার দিতে গেলেও বাকিরা যায়নি।

প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা এক রোহিঙ্গা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, সকালে ক্যাম্প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে এসেছেন। তারা বলেছেন তালিকায় আমার পরিবারের নাম রয়েছে। সাাৎকার দিতে বিকালে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাবো না। যে দেশ থেকে নি’র্যাতনের শিকার হয়ে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই না। নির্যা’তনের বিচার পেলেই কেবল ফিরে যাবো।

রোহিঙ্গা’দের শীর্ষ নেতা রহিম উল্লাহ বলেন, ?মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রথম বৈঠকে যে দাবি দাওয়া দেয়া হয়েছিল। তার একটিও মেনে নেয়নি মি’য়ানমার। যে কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ান’মারে যেতে প্রস্তুত না।

এদিকে মিয়ানমার প্রতিনিধিদল ২০ আগস্ট সারাদিন নানা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি অলস সময় কাটিয়েছেন সাাৎকার নেয়ার স্থানে।

এ তথ্য নিশ্চিত করে আরআরআরসির প্রতিনিধি এবং জাদিমুরা ও শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বেনারকে বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত এই রোহিঙ্গারা তাদের মতামত জানিয়েছেন।

তাদের মতামত একটি ফরমে লিপিবদ্ধ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকে অবহিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা সব রোহিঙ্গার সাাৎকারের জন্য আনা যায়নি, যোগ করেন সরকারি এই কর্মকর্তা।

টেকনাফের শালবাগান শরণার্থীশিবিরে তৈরি করা বিশেষ আটটি ঘরে ইউএনএইচসিআর এবং আরআরআরসির কর্মকর্তারা প্রত্যাবাসনে তালিকাভুক্তদের সাাৎকার নেন। এ সময় রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং গণহত্যাকা’রীদের বিচার চেয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেদের ফেলে আসা সম্পত্তির অধিকার এবং তিপূরণ চায় রাখাইন রাজ্য ত্যাগে বাধ্য হওয়া এই দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, আমরাও চাই প্রত্যাবাসন শুরু হোক। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন হলে সহযোগিতা করতেও রাজি আছি। কিন্তু এভাবে হঠাৎ করে কীভাবে প্রত্যাবাসন শুরু হয়? তার দাবি, গত মাসে রোহিঙ্গা শিবির সফরকারী মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে ফের সংলাপে বসার কথা বলেছিলেন।

আমাদের  সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়া হলে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না বলেই ধারণা। তাছাড়া এই মুহূর্তে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি, বলেন মুহিব।

রাখাইনের পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক নয় ?উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেদেশে যেসব রোহিঙ্গা রয়ে গেছে তারাও বন্দি জীবনযাপন করছেন। এর আগে গত শুক্রবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দেশটির সরকারি মুখপাত্র জ থে এক প্রেস কনফারেন্সে জানান, ২২ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন শুরু হচ্ছে এবং তারা কক্সবাজার থেকে তিন হাজার ৫৪০ জনকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে আরআরআরসি জানায়, দুই দফায় মিয়ানমারকে ২২ হাজার ৪৩২ এবং ২৫ হাজার সাতজন রোহিঙ্গার দেয়া হয়েছে। এর মধ্য থেকে ওই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছাড়পত্র দিয়েছে। যারা এই ছাড়পত্র পেয়েছে তাদের ঘরে ঘরে খবর পৌঁছানোর পর গতকাল সকাল থেকে ইউএনএইচসিআরকে সাথে নিয়ে মতামত নেয়া শুরু করা হয়।

ইউএনএইচসিআর এবং আরআরআরসির মোট ১০টি দল ঘরে ঘরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের মতামত জানাতে আসতে উৎসাহিত করে। এ সময় কিছু রোহিঙ্গা তাদের বাধা দেয়। পরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনেন।

টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক রাকিবুল ইসলাম বেনারকে বলেন, কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা চেষ্টা করছিল, পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকায় ব্যর্থ হয়। পরে দুপুর আড়াইটার পর রোহিঙ্গারা সাাৎকার দিতে আসতে শুরু করেন।

প্রত্যাবাসনের ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গা আবু ছিদ্দিকের (৩০) বাড়ি মংডু গজবিল এলাকায়। সাাৎকার দিয়ে বের হয়ে তিনি বেনারকে বলেন, আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে মিয়ানমারে যাব কিনা? জবাবে ‘না’ বলেছি। কেন যাবেন না জানতে চাইলে ফেলে আসা সহায়-সম্ব^ল, নাগরিকত্ব ও গণহ’ত্যার বিচার পেলে যাওয়ার কথা বলেছি।

২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার এলাকাতেই প্রথম হামলা চালিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেখানে মৃত্যু’র মুখ থেকে ফিরে এসেছি, সেখানে কি আবার মরতে যাব? এটি কখনোই হতে পারে। সেখানে এখনো আমাদের যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

আরেক সাাৎকারদাতা আবু তাহের ওরফে সোনা মিয়া (৪০) বেনারকে বলেন, ইউএনএইচসিআর আর ক্যাম্প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে বলেছি, আমি এখন মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নেই। কেননা সে দেশের সরকারই মানুষ হ’ত্যা করে।

জীবনের নিরাপত্তা এবং আমার ভিটে মাটি ফিরে না পেলে কেন যাব? প্রশ্ন রাখেন তিনি। প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা সাবেকুন নাহার (২৫) বেনারকে বলেন, মিয়ানমারে আমরা ফিরতে চাই না। সেদেশে আমার ভাইয়ের গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তার লা’শ দাফন করারও সুযোগ পাইনি।

বাংলাদেশে মারা গেলে অনন্ত লা’শ দাফনের সুযোগ পাব, উল্লেখ করে এই রোহিঙ্গা নারীও বলেন, সেদেশে যারা এখনো রয়েছে, তাদের জি’ম্মি করে রেখেছে। এ অবস্থায় আমরা কি করে যাবো?

মিয়ানমারের তালিকায় থাকা তিন হাজার ৫৪০ জনের মধ্যে তিন হাজার ৩১০ জনই জাদিমুরা ও শালবাগানের জানিয়ে ওই দুই শরণার্থী ক্যাম্পের ইনচার্জ খালেদ বলেন, বুধবারও (গতকাল) তাদের মতামত নেয়ার চেষ্টা অব্যা’হত থাকবে।

২২ আগস্টের মতো গত বছরের নভে¤¦রেও প্রত্যাবাসন শুরুর একটা একটা সম্ভাবনা ছিল উল্লেখ করে বিশ্লেষকেরা বলছেন, তখনো শুরু হয়নি, এবারও যে হবে না তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়

মিয়ানমার কূটনৈতিক’ভাবে খুবই চতুর চাল চেলেছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনে বেনারকে বলেন, চীন-ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের কাছে কিছুটা নতি স্বীকার করে তারা হয়তো বলছে রোহিঙ্গা’দের ফেরত নেবে, কিন্তু রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেনি। তার দাবি, মিয়ানমার প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার দায়ভার বাংলাদেশ বা রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে।

এরপর তারা বলবে আমরা ফেরত নিতে চাচ্ছি, কিন্তু বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে না কিংবা রোহিঙ্গারা আসতে চাচ্ছে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের েেত্র মাঠ পর্যায়ে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা নিঃস’ন্দেহে জটিল। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয় অনেক দেশের অনেক সংস্থা কাজ করছে। তারা রোহিঙ্গাদের মতামতকে প্রভাবিত করছে কিনা, তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে, যোগ করেন তিনি

 

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে দেশটির আই’নশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই সময় প্রাণে বাঁচতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রি’ত রোহিঙ্গা’র সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭।

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে