২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
ঝালকাঠিতে ইলিশ নিধন অ’পরাধে তিন জেলেকে কা’রাদ’ন্ড বগুড়ায় সাংবাদিক পীর হাবিবের বি’রুদ্ধে অপপ্রচারের... আখাউড়ায় কমিউনিটি পুলিশিং সভা ও মা’দক বি’রোধী সমাবেশ... বানারীপাড়ার মেয়ে মৃত্তিকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র... জৈন্তাপুরে মা’দক ব্যবসায়ীদের হা’মলায় ৬ পুলিশ...

আহারে জীবন…

 অনলাইন ডেস্ক: সমকালনিউজ২৪
আহারে জীবন…

ছোটবেলায় গ্রামে দাদাবাড়িতে আসলে নবু শীল, রমেশ শীল আমাদের চুল কাটতেন। বয়স্ক এই দুই জনকে আমরা নবু দাদা, রমেশ দাদা বলে ডাকতাম। আমাদের খুবই স্নেহ করতেন, তারপরও পাটের মলিন ঝোলা হাতে তাদের বাড়ি কাছাকাছি দেখলেই ভয় লাগতো। তারা আসলে বাংলা ঘরের সামনে পিড়ি পেতে ছোট বড় সবাই তাদের ক্ষুর, কাঁচির নিচে বসে যেতো। একেবারে ছোটদের জন্য অবশ্য পিড়ির পরিবর্তে ছিল জলচৌকি।

এরপর বিশেষ কায়দায় মাথাকে দুইপায়ের ফাঁকে চেপে ধরে প্রথমে ঘাড়ের উপর পরে গোটা মাথায় ইচ্ছামতো ক্ষুর কাঁচি চালিয়ে খেউড়ি ( স্থানীয় নাম) করতেন। মাঝে মাঝে পাথরও চামড়ার বেল্টের মতো এক বস্তুতে ক্ষুর, কাঁচি শান দিয়ে নিতেন। ক্ষুর চালানোর সবিধার্থে কাসার ছোট একটা বাটিতে পানি রাখতেন। সেখান থেকে নিয়ে মাথাভিজিয়ে নিতেন। কিছক্ষন ক্ষুর কাঁচি চালানোর পর মাথার চুল এক অদ্ভুদ আকার ধারন করতো। পরে সেলুনে চুল কাটলেও কোথাও গড়বড় পেলে একজন আরেকজনকে নবু ছাঁট, রমেশ ছাঁট বল ক্ষেপাতাম।

তাদের চুল কাটার ধরণটাও ছিল ভিন্ন। সারা বছর তারা বাড়িতে এসে চুল, দাড়ি কামাতেন। এমনকি পরিবারে কোন নতুন সদস্য জন্ম নিলে তারও। বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসাবে ইরি মৌসুমে তারা ধান নিতেন। বৈশাখ মাসে খলায়( ধান মাড়ানো ও শুকানোর স্থান) ধান আসা মাত্রই তারা বস্তা নিয়ে হাজির হতেন। যারা গ্রামে বড় হয়েছেন কিংবা নিয়মিত গ্রামে যেতেন সবার ছেলেবেলার ছবিটা এমনই।
হুমায়ুন আহমেদ তার ফাউন্টেন গল্পে লিখেছেন” আমার শৈশবের একটা অংশ নাপিতের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে কেটেছে। বাবা এক হিন্দুস্থানী ( ভোজপুরী) নাপিতের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে বাসায় এসে বাচ্চাদের চুল কেটে দিত। নরুন দিয়ে নখ কাটত। তাকে দেখামাত্র পালিয়ে যাওয়া ছিল আমার প্রথম রিফ্লেক্স অ্যাকশন। পালিয়ে রক্ষা নেই। নাপিতই আমাকে ধরে আনত। মাটিতে বসিয়ে দুই হাটু দিয়ে মাথা চেপে ধরত। কান্নাকাটি চিৎকার করে কোন লাভ হতো না।”

অবশ্য বাবার কর্মস্থলে আসলে কাঁচঘেরা সেলুনে, ফোমের ঘূর্নায়মান চেয়ারে বসে চুল কাটাতাম। সরকারি কলোনী ও স্কুলের কড়াকড়িও আমাদের নতুন কিছু করা থেকে আটকাতে পারত না। হাইস্কুলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বড় ভাইদের দেখে রাহুল কাট দিলাম। বোম্বের (বর্তমান মুম্বাই) সে সময়কার আলোচিত নায়ক রাহুল রায়ের অনুকরণে নব্বই দশকে উঠতি তরুন, কিশোরেরা চুলে রাহুল কাট দিতেন। এখনকার প্রজন্ম অবশ্য রাহুল রায়কে তেমন চেনে না। প্রথম রাহুল ছাঁট দিয়ে স্কুলে যাওয়ার পর এক কাণ্ড ঘটলো। ইংরেজির নাসির স্যার ক্লাসে ঢুকেই খেয়াল করলেন এবং সামনে আসতে ইশারা করলেন। সে সময় আমরা নাসির স্যারকে যমের মতো ভয় পেতাম। স্যার ডাকার পর আমার আত্নারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার যোগাড়!! ভয়ে ভয়ে সামনে আসতেই স্যার আমাকে ঘুরতে বললেন। আমি পিঠে বেতের ঘা পরার অপেক্ষা করছি। দেখলাম, স্যার তেরঙ্গা জালি বেতটা ঘাড়ের কাছে নিয়ে সবাইকে বললেন, ” তোরা দেখ, হেয় রুহুল কাটছে। তারপর স্যার দিলেন বিখ্যাত ডায়লগ” ওই মিয়া, আমি আর মান্নান ভূঁইয়া( প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, বিএনপির সাবেক মহাসচিব, স্যার ও জনাব ভূঁইয়া ছিলেন বাল্যবন্ধু ও একাত্তরের রনাঙ্গনের সহযোদ্ধা) কী কোন দিন রাহুল কাটছি নাকি? আমি না হয় খারাপ কাম করি, বেডায় তো বিরাট মন্ত্রী। মিয়া ভালা কইরা পড়, খালি চুলের এই সব রুহুল কাইট্টা জীবনে কোন লাভ।” স্যারে কথার পর সবার হাসার ইচ্ছা থাকলেও ভয়ে পারিনি। তবে এখনও কোন আড্ডায় স্যারে গল্প তুলে হাসি। মহান আল্লায় শ্রদ্ধেয় স্যারকে দীর্ঘজীবি করুন।

এছাড়া আরও কিছু ছাঁটও ছিল সে সময়ের তরুনদের পছন্দের। যেমন- বোম্বের হার্টথ্রুব নায়ক সঞ্চয় দত্তের ঘাড়ের উপর ছড়ানো লম্বা চুলের ষ্টাইলও ছিল তরুনদের কাছে জনপ্রিয়। সুপারহিট সিনেমা সাজন, সাদাকের পর সুনীল- নার্গিস তনয় সঞ্জু বাবা এদেশের শহর, মফস্বল ছাড়িয়ে গ্রামের যুবকদের কাছেও ফ্যাশন আইকন। রেবনের সানগ্লাস চোখে, জ্বলন্ত সিগারেট মুখে সঞ্চয় দত্তের একট পোষ্টার ঘরের দেয়ালে টানানো না থাকলে সেই ছেলে আবার স্মার্ট হয় কীভাবে? আমাদের সময় একটা প্রজন্মের কাছে ধারণাটা অনেকটা এমনই ছিল। মনে আছে, সে সময় বায়তুল মোকারমের পশ্চিম গেট থেকে ৬০ টাকা দিয়ে সঞ্জয় দত্ত ও ৪০ টাকা দিয়ে সালমান খানের পোষ্টার কিনে ছিলাম। পরবর্তীতে অবশ্য ঢাকাই হিরো সালমান শাহের পোষ্টারও বিক্রি হয়।

এর আগেও তরুনদের চুল কাটার নানা ছাটঁ ছিল। জনাব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, তখন কদম ছাঁট ও বাটি ছাঁট প্রচলিত ছিল। চুল কাটার পর মাথার উপরের দিকটা কদম ফুলের পাপড়ির মতো হলো কদম ছাঁট। আবার বাটির আকার ধারণ করলে বাটি ছাঁট।

আগের দিনে নরসুন্দর বা নাপিতরা ছিল বিশেষ সম্প্রদায়ভূক্ত। তবে এখনকার তরুনরা আর বংশপরম্পরায় এ পেশায় আসতে আগ্রহী না। হারিয়ে যাচ্ছে চিরাচরিত গ্রাম বাংলার নরসুন্দরদের জীবনজীবিকার ধরণ ও চিত্র। এখন আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল দাড়ি কামানোর চিত্র চোখে পড়ে না। গ্রামের হাটবাজারেও বট গাছের নিচে পিড়ি পেতে বসা নাপিতদের দেখা পাওয়া যায় কিনা জানি না। তবে অজপাড়াগায়েও কাঁছঘেরা সুসজ্জ্বিত সেলুন। নতুন, নতুন চুলের ছাঁট প্রসাধন। শহর, মফস্বলে ছেলেদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জেন্টস পার্লার।

জানা যায়, ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় “বার্মেল চ্যাং লিউ শেই “নামক বিউলি পার্লারের মাধ্যমে ঢাকায় পার্লার যুগের গোড়াপত্তন হয়। ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু করে “মে ফেয়ার।” তখন কেবল ঢাকাই চলচ্চিত্রের নায়িকা ও বিত্তশালী পরিবারের নারীদের আসা যাওয়া ছিল এখানে। স্বাধীনতা পর ১৯৭৭ সালে প্রথম “জেরিনা লিভিং ডল” নামে পার্লার ব্যবসা শুরু। আশি দশকে হাতে গোনা হলেও ৯০ দশক থেকে পাড়া মহল্লা, জেলা মফস্বল শহরগুলোতে পার্লার ছড়িয়ে।

আমরাও নবু দাদা, রমেশ দাদার দুপায়ের ফাঁক থেকে মাথা বের করে রাহুল, সঞ্চয় ছাঁট দিতে শুরু করি।

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে