১৮ই জুন, ২০১৯ ইং ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
সংবাদ প্রকাশের পর ডিসির সহযোগীতায় ভাতা কার্ড পেল ১৩ জন... নওগাঁয় পাটক্ষেত থেকে দুই কিশোরসহ মোট ৩জনের লাশ উদ্ধার ভারত থেকে বেনাপোল দিয়ে দেশে ফিরল বাংলাদেশি ৬ নারী চয়ন কে মামলা থেকে বাঁচাতেই প্রতিবন্ধী শরিফুলের... রাজাপুরে কৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

কালাইয়ে সহিংসতা গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষ শুন্য এলাকা

 রনি আকন্দ, কালাই সমকাল নিউজ ২৪

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ১০ মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উপজেলার মোসলেমগঞ্জ বাজার ও নিকটবর্তী থল-উদয়পুর গ্রাম এলাকার হাটপুকরা নামক স্থানে গত শনিবার রাতে আওয়ামীলীগের দু’ গ্রুপের সংঘর্ষে ব্যাপক ভাংচুর, ২ জন নিহত ও অন্তত ২৩ জন আহত হন।এ ঘটনার জের ধরে উদয়পুর ইউপি চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলী দাদা , মাত্রাই ইউপি চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবিব তালুকদার লজিকসহ ৪৭ জন এজাহার নামীয় আসামীসহ অজ্ঞাত আরো ১৫০-২০০ জনের বিরুদ্ধে কালাই থানায় মামলা হয়। ফলে গ্রেফতার এড়াতে পুরুষরা ভিটে ছাড়া হওয়ায় ওই এলাকার কয়েকটি গ্রাম এখন প্রায় পুরুষ শূন্য।

জানা গেছে, গত ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত কালাই উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন তৃতীয় বারের মত নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা মাত্রাই ইউপি চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবিব তালুকদার লজিকও উপজেলা চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন প্রত্যাশি ছিলেন এবং লজিককে সমর্থন করেন উদয়পুর ইউপি চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলী দাদা । তখন থেকেই মিনফুজুর রহমান মিলন বনাম শওকত হাবিব তালুকদার লজিক ও ওয়াজেদ আলী দাদা এ দু’গ্রুপের নেতা-কমী-সমথর্কদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল এবং ওই বিরোধের স‚ত্র ধরে ওই দিন এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানান নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক এলাকাবাসীসহ আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা।

শনিবার (গত ১৬ মার্চ)সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মোসলেমগঞ্জ থল-উদয়পুর এলাকার হাটপুকরা নামক স্থানে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় উপজেলার পুনট মোন্না পাড়ার মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে আফতাব হোসেন (৫৫) এবং মাহিষ্য পাড়ার চারু মোহন্তের ছেলে রতন মোহন্ত (৪৮) নিহত হন ও অন্তত ২৩ আহত হয়েছে বাজারে দু’ গ্রুপের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ২টি মোটর সাইকেলসহ অন্তত ১০টি দেকান ঘরে ভাংচুর, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

পরে গত রোববার রাতে নিহত আফতাব সরকারের ছেলে গোলাম রব্বানী বাদী হয়ে কালাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ হত্যা মামলায় মাত্রাই ও উদয়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ ৪৭ জনকে এজাহার নামীয় আসামী কর হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরো ১৫০-২০০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা কর হয়েছে। আর এ মামলায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করেছে কালাই থানা পুলিশ । এ মামলায় এজাহার নামীয় ৪৭ জন ছাড়াও অজ্ঞাত ১৫০-২০০ জনকে আসামী করার কারণে গ্রেফতার আতঙ্কে উদয়পুর ইউপি’র নওয়ানা, কৃষ্টপুর গ্রামসহ আশ পাশের কয়েকটি গ্রামে এখন প্রায় পুরুষ শুন্য অবস্থা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নওয়ানা ও কৃষ্টপ‚র গ্রামে শুধুমাত্র শিশু ও নারীদের দেখা গেলেও পুরুষদের চোখে না পরার কারন জিজ্ঞাসা করলে ভুট্টোর স্ত্রী জাহানারা(৩৫), ন‚র মোহাম্মদের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৪২) জানান, অজ্ঞাত সংখ্যক আসামী করা মানে এ গ্রামের সবাই আসামী, তাই পুরুষ মানুষ বাড়ি থাকে না। মাছুদ রানার স্ত্রী শাম্মী আকতার(২৮), সোহেল রানার স্ত্রী কুসুম আকতার (২৩) জানান, ‘আমাদের স্বামীরা এখন ভিটা ছাড়া, বাজার করার অভাবে কোন রকমে সংসার চলছে।’ মাহবুব হোসেনের স্ত্রী সরবানু(৪০) জানান, এখন তো বিএনপি-জামায়াত-শিবির নাই বাবা, আওয়ামীলীগের সাথে আওয়ামীলীগের লড়াইয়ে পরে গরীবই মরছে আবার গরীব মানুষেরা আসামী হয়ে এলাকা ছাড়া।

এ ধরনের নানা মন্তব্য করে লুৎফর রহমানের স্ত্রী সাহানা খাতুন(৪০), আছাহাকের স্ত্রী রোকসানা(৩৩), নুরুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম বেগম(৪৫)সহ ওই দু’টি নারীরা জানান, গত রোববার কালাই থানায় দুই জন হত্যা মামলার খবর পেয়ে গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামের পুরুষরা গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় ধান রোপন ও পরিচর্যার এ ভরা মৌস‚মে কৃষি কাজ ব্যাহত হওয়ায় বোরো মৌস‚মে ফলন হানীর আশঙ্কা করছেন গৃহবধ‚রা। অন্য দিকে এসব এলাকার শিশু-কিশোরসহ শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে ভীতির ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। নওয়ানা গ্রামের ‘নওয়ানা এস ইউ দাখিল মাদরাসায় গ্রেফতার আতঙ্কে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার খুবই কম দেখা গেছে।

শিক্ষার্থীদের শ্রেনি ভিত্তিক হাজিড়া খাতা দেখে জানা গেছে, ৭ম শ্রেণীর মোট শিক্ষার্থী ৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিতি ২০ থেকে ২৫ জন, ৮ম শ্রেণীর মোট ৩৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিতি ২০ থেকে ২৫, ৯ম শ্রেণীর মোট ৪৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিতি ৩০ থেকে ৩২ জন ও ১০ম শ্রেণীর মোট ৩৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিতি থাকে ১৭ থেকে ২০ জন। তবে মামলার কারনে সোমবার (আজ) উপস্থিতি ছিল সপ্তম ও অষ্টম শ্রেনিতে ৩ জন করে এবং নবম ও দশম শ্রেনিতে ২ জন করে মোট মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী।

এ ব্যাপারে নওয়ানা এস ইউ দাখিল মাদারাসার সুপার মুক্তার হোসেন জানান, নির্বাচনী পরবর্তী সহিংসতায় দুই জন মারা যাওয়ার কারণে অজ্ঞাত মামলা হওয়ায় গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামবাসীরা তাদের সন্তানদেরও মাদরাসায় আসতে দিচ্ছেন না। এ ছাড়া অভিভাবকরাও ভয়ে গ্রাম ছাড়া হওয়ায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি খুবই কম।

এ নিয়ে কালাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল লতিফ খান জানান, গ্রামবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পুলিশ নিরীহ কাউকে হয়রানী করবে না । প্রকৃত দোষীদেরই শুধুমাত্র গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান ওসি।

Print Friendly, PDF & Email

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে