২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
ঝালকাঠিতে ইলিশ নিধন অ’পরাধে তিন জেলেকে কা’রাদ’ন্ড বগুড়ায় সাংবাদিক পীর হাবিবের বি’রুদ্ধে অপপ্রচারের... আখাউড়ায় কমিউনিটি পুলিশিং সভা ও মা’দক বি’রোধী সমাবেশ... বানারীপাড়ার মেয়ে মৃত্তিকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র... জৈন্তাপুরে মা’দক ব্যবসায়ীদের হা’মলায় ৬ পুলিশ...

কালের স্বাক্ষী জৈন্তাপুরের সতিনাথ মন্দিরের জরাজীর্ণ অবস্থা।

 শোয়েব উদ্দিন, জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি। সমকালনিউজ২৪

ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা করার জন্য তৈরি করা হতো মন্দির। মানুষ তাদের দুঃখ কষ্ট, চাওয়া পাওয়ার হিসেব চুকাতে আসত মন্দিরে, আজও আসে। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা এই পৃথিবীর বুকে বহু মন্দির তৈরি করেছেন। মানুষের রোষের কবলে পড়ে বেশ কিছু মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। কিছু কিছু মন্দির সম্পর্কে একদমই ভুলে যাওয়া হয়েছে। তবে সৃষ্টির শত বছর পরেও স্রষ্টার কিছু কিছু প্রার্থনালয় আজও এমন অক্ষত অবস্থায় রয়েছে, তা দেখলে চমকে উঠতে হয়। প্রাচীন ঐতিহ্য আর পুরাকীর্তি খোঁজে ঘুরে বেড়ান যারা তাদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ শত বছর আগে নির্মিত পাহাড় টিলা ঘেরা সবুজের মধ্যে একটি অপূর্ব স্থানে প্রাচীন ভিত্রিখেল গ্রামে সতিনাথ মন্দিরের অবস্থিত। ভিত্রিখেল গ্রামের পাহাড় কোল ঘেষে প্রাচীন আমলে পরস্পর সংলগ্ন দুটি মন্দির দেখা মিলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মন্দির দুটি ভৈরব মন্দির নামে পরিচিত। দুটি মন্দিরের মধ্য খানে আরেকটি মন্দিরের ধ্বংসাব শেষ দেখা যায়। আর সে গুলোর পাশ্বে রয়েছে একটি পুকুর, যে টি সেবায়েত ও পুজারীদের পানি ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।মন্দির দুটির পুরোটাই অক্ষত রয়েছে তবে সেখানে পুজা কিংবা কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না।

 

জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে এ পর্যন্ত যে কয়েকটি বই বিভিন্ন লেখক গবেষকেরা প্রকাশ করেছেন তাদের প্রকাশিত গ্রন্থে জৈন্তিয়া রাজ্যের এই পুরার্কীতির কোন ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি কিংবা তারা এই পূরার্কীতিটি কখনো তাদের নজরে আসেনি বলে মনে হয়। সম্প্রতি জৈন্তিয়া রাজ্যের অজানা পূরার্কীতির অন্যন্য এই নির্দশনটির কথা উল্লেখ করেন ফিন্যান্স সাংবাদিক, লেখক এবং কলামিষ্ট আব্দুল-হাই-আল হাদি প্রকাশিত “সিলেটের প্রত্নসম্পদ” বইটিতে সতিনাথ মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছেন। এই মন্দিরের ইতিহাস পাওয়া না গেলেও এই মন্দির নিয়ে একটি অন্যতম লোক কাহিনী রয়েছে ।

 

লোক কাহিনী মতে জানাযায়, ১৯৭০ সালে জৈন্তিয়ার দ্বিতীয় রাজা রাম সিংহ এখানে মন্দির দুটি নিজ হাতে নিমার্ণ করেন চারিকাটা ইউনিয়নের পূর্বভিত্রিখেল গ্রামে। সতিনাথ নামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী বসবাস করতেন সেখানে। সে গ্রামের অনতিদুরে ছিল আরেক মুসলিম সুফির বসবাস। একদিন সন্ধ্যায় হিন্দু সন্ন্যাসী মুসলিম সুফির বাড়ীতে যান এবং সুফিকে বলেন যে, আজ সন্ধ্যায় দুজন রাজার বাড়ীতে যাবেন। মুসলিম সুফি বলেন, সন্ধ্যার সময় পায়ে হেঁঠে রাজার বাড়ীতে যাওয়া সম্ভব নয়। তৎক্ষনিক ভাবে সন্ন্যাসী সুফির জায়নামাজে বসে রাজার বাড়ীতে চলে যান। ঐ দৃশ্য দেখে মুসলিম সুফি অবাক হয়ে যান। সন্নাসী রাজবাড়ীতে উপস্থিত হয়ে রাজ কর্মচারীদের কাছে রাজার সাথে দেখা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তৎক্ষনাৎ তারা জানান, রাজা মশাই সন্ধ্যা বাতি নিয়ে ব্যস্থ আছেন, তাই উনার (রাজার) সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। একথা শুনে সন্ন্যাসী জানান, আপনাদের কথা টিক নয়, রাজার হাতি গুলো এখন কোন কোন জায়গায় রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করছেন তিনি। রাজ কর্মচারীরা অন্দর মহলে গিয়ে রাজা মহাশয়কে কথাটি জানালে তিনি (রাজা) হতবাক হয়ে যান। সত্যিই তিনি সন্ধ্যা বাতির সময় একটি হাতির কথা চিন্তা করেছিলেন। রাজা সন্ন্যাসীদেরকে আপ্যায়ন করানোর আদেশ দেন এবং বলেন যে, একটি কাঠালের মধ্যে যেন সব গুলো কোষ রেখে দেওয়া হয়। এটি সন্ন্যাসী পরীক্ষার জন্য রাজার কৌশল ছিল মাত্র। আপ্যায়নের একপর্যায় সন্ন্যাসী একটি কাঠাল ভাঙ্গেন এবং রাজাকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সে কাঠাঁলটির মধ্যে কেবল মাত্রকোষ। তা দেখে রাজা অবাক হয়ে যান। তিনি সন্ন্যাসীদের অনেক আদর আপ্যায়ন করে রাতে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরদিন রাজা পাথর বোঝাই করে অনেক গুলো হাতিসহ সন্ন্যাসীর বাসস্থানে যান এবং সেখানে একটি মন্দির ও পানি ব্যবহারের জন্য একটি পুকূর খনন করে দেন। পরবর্তী সময়ে রাজা সে সন্ন্যাসীকে রাজদরবার হতে দামী উপহার সামগ্রী পাঠাতেন। সন্ন্যাসী মৃত্যুর পর রাজা সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ব তৈরী করেন।

 

বর্তমানে সেখানে পরপর দুটি মন্দির ঘর ও মন্দির প্রঙ্গনে একটি পুকুর বিদ্যমান রয়েছে। মন্দিরের কিছু অদুরে একজন পুরোহিত বাসবাস করেন। তিনি এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা অবহিত নন। তবে তিনি দাবী করেন তারপূর্ব পুরুষেরা প্রজন্মান্তরে মন্দিরের সেবা করে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে পুজা অর্চনা তারাই করে থাকেন।

 

পুরার্কীতি সংস্কার ও সংরক্ষনের অভাবে আমেদের জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম পূরার্কীতি গুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।জৈন্তিয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই পুরার্কীতি গুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়নের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা আবশ্যক ও সময়ের দাবী জানান জৈন্তাপুর উপজেলার সচেতন মহল।

 

প্রত্নতাত্তি¡ক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত। জৈন্তাপুরে শত বছরের ইতিহাস, জাতিসত্ত্বা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্তি¡ক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে।অথচ আমাদের জৈন্তাপুরে এই মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষণের যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।এরই ধারাবাহিকতায় ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের সাক্ষ্য মহা মূল্যবান প্রত্নতাত্তি¡ক নিদর্শন, প্রাচীণ স্থাপত্য কাঠামো ও প্রত্ননিদর্শন। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা।

 

প্রত্নতত্ত¡ সম্পর্কে জানাতে চাইলে সেভ দ্য হেরিটেজ এন্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল হাই আল হাদী জানান- প্রত্নতত্ত¡ বাংলাদেশের এক অনুপম সাংস্কৃতিক নিদর্শন। পৃথিবীর যে কয়েকটি স্থান প্রত্নতত্ত¡ জন্য বিখ্যাত, তার মধ্যে জৈন্তাপুর অন্যতম। এগুলোর সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা সত্যিই জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পর্যটন কর্পোরেশনসহ সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

 

ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন- আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ জৈন্তারাজ্যের পুরার্কীতি গুলো রাজার আমলে যেভাবে ছিলো টিক সেই ভাবে সংরক্ষন করে রাখলে পুরার্কীতি সম্পর্কে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা সটিক ইতিহাস জানতে পারবে।

 

মন্দিরটিতে যে ভাবে যাবেন, সিলেট, দরবস্ত কানাইঘাট সড়কের চতুল বাজারে অবস্থান করে সেখান থেকে সোজা উত্তর দিকে লালাখাল চা বাগানের দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরে রাস্তার পশ্চিম দিকে পূর্ব ভিত্রিখেল গ্রামে সতিনাথ মন্দিরের অবস্থান।

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
সিলেট বিভাগের সর্বশেষ
সিলেট বিভাগের আলোচিত
ওপরে