১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আ’ক্রান্তদের মাঝে বিনামূল্যে... নওগাঁয় ইজিবাইক চালকের ম’রদেহ উ’দ্ধার প্রায় ৩০ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার কেমিক্যাল জ’ব্দ সাপাহারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পিইসি ও ইবতেদায়ী পরীক্ষা... ঠাকুরগাঁওয়ের কলেজ ছাত্রের ঝু’লন্ত ম’রদেহ উ’দ্ধার

ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানুন; সুস্থ থাকুন

  সমকালনিউজ২৪

বাংলাদেশে ৬.৪ % অর্থাৎ ৮০ লক্ষ লোক ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। যা প্রায় প্রতি ১১ জনে ১জন! শুধু তাই নয় যতজন রোগী চিহ্নিত আছে ঠিক তত পরিমান লোক জানেই না তারা ডায়াবেটিস বহন করছে।

ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে!
১ জন ডায়াবেটিস রোগীকে অন্য যেকোন রোগী অপেক্ষা দ্বিগুণ পরিমান ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয় এবং প্রায় ১০ গুণ বেশী ওষুধে খরচ হয়। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে হবে। কেননা ৭০-৮০% ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। তাই সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানতে হবে।

ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস (ইংরেজীতে Diabetes Mellitus যা বাংলায় বহুমূত্র, মধুমেহ নামে পরিচিত) আসলে এটি একটি হরমোন সংশ্লিষ্ট রোগ। আমাদের দেহের অগ্নাশয় নামের অঙ্গের বিটা সেল থেকে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। দেহের প্রয়োজনানুযায়ী ইনসুলিন নিঃসৃত না হলে কিংবা উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে দেহের অকার্যতা দেখা দিলে রক্তে শর্করা বা চিনি এর পরিমানে অসমতা দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে দেহে একটি সমস্যা বিরাজ করে। দেহের মধ্যে সৃষ্ট এ সমস্যা বা রোগটিই হলে ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। অর্থাৎ ইনসুলিনের ঘাটতিই এ রোগের মূল বিষয়।

ইনসুলিন উৎপাদন কিংবা ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা না থাকা এর যেকোন একটি কিংবা দুটোই রক্তে গ্লুকোষ বাড়িয়ে দিতে পারে। শারীরিক এ সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেই ঘটতে থাকে নানা জটিলতা। বিকল হতে থাকে দেহের বিভিন্ন কোষ এবং এক এক করে সকল যন্ত্র (অর্গান)।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ

যে কেউ যেকোনো বয়সে যেকোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে নিম্নোক্ত শ্রেণির ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে-

ক. যাদের বংশে বিশেষ করে বাবা-মা বা রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে
খ. যাদের শরীরের ওজন অনেক বেশি এবং যারা শারীরিক পরিশ্রমের কোনো কাজ করেন না কিংবা ব্যায়াম করে না
গ. যারা ধূমপায়ী এবং বহুদিন ধরে কর্টিসোল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন।
. যেসব মহিলার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ছিল আবার যেসব মহিলা ৯ পাউন্ডের বেশি ওজনের বাচ্চা প্রসব করেছেন।
. যাদের রক্তচাপ আছে এবং রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকে।

 

ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো

ডায়াবেটিস রোগের সাধারণ কিছু লক্ষণ রয়েছে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখলে সহজেই চিহ্নিত করা যায় ডায়াবেটিস। আর যত আগে ডায়াবেটিস চিহ্নিত করা যাবে, তখনই নিতে হবে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ। ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো হলো-
. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
২. ঘন ঘন তেষ্টা পাওয়া
৩. নিয়মিত খাওয়ার পরও ঘন ঘন খিদে পাওয়া
৪. প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত অনুভব করা
৫. চোখে ঝাপসা দেখা
৬. শরীরের বিভিন্ন অংশের কাটাছেঁড়া সহজে না শুকানো
৭. পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া
৮. হাতে-পায়ে ব্যথা বা মাঝে মাঝে অবশ হয়ে যাওয়া

 

ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয়ের উপায়

রক্তের গ্লুকোজের মাত্রার পরিমাপ করে ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে হয়। সুস্থ ব্যক্তির রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ অভুক্ত অবস্থায় ৬.১ মিলি.মোলের কম এবং খাবার ২ ঘণ্টা পরে ৭.৮ মিলি মোলের কম অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ ১১.১ মিলি.মোলের কম থাকে। কোনো ব্যক্তির রক্তের প্লাজমায় অভুক্ত অবস্থায় গ্লুকোজের পরিমাণ ৭.০ মিলি মোল বা তার বেশি হলে এবং খাবার খাওয়ার অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ ১১.১ মিলি মোল বা তার বেশি হলে অথবা রক্তের ঐনঅ১প ৬.৫%-এর বেশি হলে তাকে ডায়াবেটিস রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় করণীয়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অবশ্যই নিচের বিষয়গুলোর খেয়াল রাখতে হবে-

. ডায়াবেটিস সম্পর্কিত শিক্ষা গ্রহণ।
২. খাদ্য ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ
৩. সাধ্যমতো কায়িক পরিশ্রম অথবা নিয়মিত হাটা ও ব্যায়াম করা
৪. নিয়মিত সঠিক ঔষধ সেবন
৫. বিশেযজ্ঞ চিকিৎসকের নিয়মিত চেক-আপে থাকা

ডায়াবেটিস সম্পর্কে শিক্ষা

ডায়াবেটিস আজীবনের রোগ; তবে সঠিক ব্যবস্থা নিলে এই রোগকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই এ রোগের সুচিকিৎসার জন্য ডায়াবেটিস সম্পর্কে রোগীর যেমন শিক্ষা প্রয়োজন, তেমনি রোগীর নিকটাত্মীয়দেরও এই রোগ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা দরকার। কারণ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই অবশ্যই কোন বিশেযজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে থেকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে ভালভাবে নিতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ

ডায়াবেটিস হলে খাদ্যের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। খাদ্যের নিয়ম মেনে চলার প্রধান উদ্দেশ্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা ও স্বাস্থ্য ভালো রাখা। তাই নিয়মিতভাবে একটি খাদ্য গ্রহণের নীতি মেতে চলতে হবে-
. শরীরের ওজন বেশি থাকলে কমানো বা কম থাকলে বাড়িয়ে স্বাভাবিক করা এবং স্বাভাবিক থাকলে সেটা বজায় রাখতে হবে।
খ. চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে।
গ. শর্করাবহুল খাবার কিছুটা হিসাব করে খেতে হবে।
ঘ. আঁশবহুল খাবার বেশি খেতে হবে।
ঙ. সম্পৃক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবার কম খেতে হবে কম এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাট খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
চ. ক্যালরিবহুল খাবার নির্দেশিত পরিমাণে খেতে হবে।
ছ. নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে হবে।
জ. কোনো বেলার খাবার খাওয়া বাদ দেয়া যাবে না।
ঝ. খাবার গ্রহণের পরিমানে প্রতিদিন সমতা রাখতে হবে।

কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম

রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কায়িক পরিশ্রম কিংবা ব্যায়াম অর্থাৎ শরীরচর্চার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রম মাংসপেশির জড়তা দূর করে এবং রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। ফলে শরীর সুস্থ থাকে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন হাঁটলে শরীর যথেষ্ট সুস্থ থাকে।

সঠিকভাবে ঔষধ গ্রহণ

সব ডায়াবেটিস রোগীকেই খাদ্য ব্যবস্থা, ব্যায়াম ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পালন করতে পারলে রোগ নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। কিন্তু টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন ইনজেকশনের প্রয়োজন হয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে খাবার ঔষধ এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন ব্যবহার করতে হয়। তাই বিশেযজ্ঞ চিকিৎসকের পরার্শ মোতাবেক ঔষধ গ্রহণ করতে হবে।

নিয়মিত চেক-আপ

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য রক্তে শর্করা অর্থাৎ গ্লুকোজের পরিমান নিয়ন্ত্রণে রাখা একান্ত আবশ্যক। পাশাপাশি ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে যেকোন সময়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সমস্যা তৈরী হতে পারে। তাই একজন বিশেযজ্ঞ চিকিৎসকের নিয়মিত চেক-আপে থাকতে হবে। ফলশ্রুতিতে ডায়াবেটিস রোগী দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারবেন।

আপনি ডায়াবেটিসে আ’ক্রান্ত না হলেও ঝুঁ’কিমুক্ত নন! কারণ যেকোন সময় আ’ক্রান্ত হতেই পারেন।
সারাবিশ্বে প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। অবশ্য বাংলাদেশই দিবসটি উদযাপনের ক্ষেত্রে পথিকৃত। পরবর্তিতে জাতিসংঘ এ দিবসটিকে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। তারই ধারবাহিকতায় বরগুনাতেও এবছর হরেক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আয়োজনের মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রি ডায়াবেটিস পরীক্ষা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা অনুষ্ঠান।’ অনুষ্ঠানে ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় থাকছি আমি ও স্থানীয় সিভিল সার্জনসহ অন্যন্য চিকিৎসকগণ। ১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় স্থানীয় জেলা সরকারি গণ গ্রন্থাগার মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তাই চলে আসুন আপনার প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে। জানুন ডায়াবেটিস সম্পর্কে, জানুন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে। কারণ ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানা থাকলে অনেকটাই সুস্থ থাকতে পারবেন নিজে এবং রাখতে পারবেন পরিবারের সকলকে। তাই নিজে জানুন; অন্যকেও জানান।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কৌশল জানলেই গড়ে উঠতে পারে সুস্থ পরিবার। তাই আসুন পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি।

 

লেখক:
ডা. এম কে আজাদ
এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন), ডিইএম (বারডেম),
মেম্বার অফ আমেরিকান কলেজ অফ এন্ডোক্রাইনোলজী।
ডায়াবেটিসে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত (সিঙ্গাপুর)
ডায়াবেটিস, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
কনসালটেনট, বরগুনা জেলা সদর হাসপাতাল।

 

‘বিদ্রঃ সমকালনিউজ২৪.কম একটি স্বাধীন অনলাইন পত্রিকা। সমকালনিউজ২৪.কম এর সাথে দৈনিক সমকাল এর কোন সম্পর্ক নেই।’

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে