১৯শে মার্চ, ২০১৯ ইং ৫ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
রাকসু আন্দোলন মঞ্চকে আলোচনা সভা করতে দেয়নি প্রশাসন কালাইয়ে আ.লীগের দু”পক্ষের সংঘর্ষে ঘটনায় ইউপি... রাঙ্গামাটিতে ব্রাশ ফায়ারে প্রিসাইডিং অফিসারসহ নিহত ৭ নওগাঁর ১০ উপজেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কেন্দ্রে ভোটার... রাতের আঁধারে ঘুম থেকে জাগিয়ে হত্যা

ভাইরাস জনিত কারণ নয়: দেব-দেবতার পুজা করতেন আবু তাহের।

  ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি। সমকাল নিউজ ২৪

অজ্ঞাতরোগে আক্রান্তরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছে। আর কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়নি। ভয়-শংকা দূর হয়েছে গ্রামবাসীর । চাঞ্চল্য হয়ে উঠেছে মানুষ। খুলেছে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস ঘটনাটি কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া জনিত কারণ নয়।অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হতে তন্ত্র-মন্ত্র সাধন করতেন আবু তাহের। পূজায় সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রথমে তাঁর মৃত্যু এবং পরে তাঁর পরিবারের লোকজন মারা গেছেন বলে এই ধারনা এলাকার মানুষের। তবে এর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ শুরু করছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের ভান্ডারদহ মরিচপাড়া গ্রামে মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে অজ্ঞাতরোগে একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যু হয়। আক্রান্ত হন ওই পরিবারের ২ সদস্য সহ পাঁচজন। এই ঘটনায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে জনমনে ।

মৃত্যু বরণ করা ৫৫ কিংবা ৫৭ বছর বয়সী আবু তাহের দুই ছেলে একই দিন মৃত্যুর ঘটনায় আরও আতংক ছড়িয়ে পড়ে মরিচপাড়াসহ আশপাশের দশ গ্রামে। অসুস্থ হয়ে পড়া আবু তাহের পুত্র বধু কোহিনুর(২০), নাতী আবির(২) ও প্রতিবেশী পসিরুলের স্ত্রী সালমা বেগম (৩২)। কোহিনুর ও তার কোলের বাচ্চা আবির কে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রংপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন কোহিনুরের বাবা রবিউল ও মা হালিমা খাতুন। তারা সবাই সুস্থ ।

নিবিড় পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ শেষে চিকিৎসকরা বলেছেন, কোহিনুর ও তার কোলের বাচ্চা আবিরসহ অন্যরা এখন পুরোপুরি সুস্থ । এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঠাকুরগাঁও ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. শাহজাহান নেওয়াজ।

কোহিনুর আবু তাহেরের বড় ছেলে স্কুল শিক্ষক ইউসুফ আলীর স্ত্রী। গত২৪ ফেব্রুয়ারি ইউসুফ ও তার ছোট ভাই বই ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান একই দিন মারা যান। আর এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি তাহেরের মেয়ের জামাতা হাবিবুর রহমান বাবলু (৩৪) ও স্ত্রী হোসনে আরা (৪৬) এই রোগে মারা যান। গত ৯ ফেব্রুয়ারি মারা যান আবু তাহের।

মরিচ পাড়া গ্রামের সালমা এখন সুস্থ। পাড়া-মহল্লায় হৈ হুল্লুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি ।সংসারের কাজ-কর্ম করে সময় পার করছেন এই দুই সন্তানের জননী সালমা। তিনি বলেন প্রতিবেশীদের মৃত্যুতে আমি ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়ি। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরপর কিছু বলতে পারিনা। সালমার শ্বাশুড়ী বলেন কালির থানে গিয়ে ১ জোড়া কবুতুর দিবো এই বলে মানত করি। এরপর কবিরাজ-মাহাত এনে ঝাড়ফুঁক ও দোয়া তাবিজ করে সালমাকে সুস্থ করা হয়। সালমাও বলেন আমি ভালো হয়েছি কবিরাজী করে।

মৃত হুসনে আরার ভাইয়ের ছেলে আখতারুল ইসলাম বলেন, যদি ভাইরাসে একই পরিবারের ৫জনের মৃত্যু হয়। তাহলে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আমি কেন আক্রান্ত হলাম না ? তিনি বলেন, আমি মৃতদের গোছল করিয়েছি। দাফন কাজে ছিলাম। আরও যারা ছিল তারা তো সবাই সুস্থ। ভাইরাস নয়, এটি নিছক গুজব! তবে এই মৃত্যুর রহস্য তো আছে এমন দাবি করেন আখতারুলসহ গ্রামের অনেকে।

আবু তাহের পেশায় ছিলেন চাল ব্যবসায়ী। পরে কৃষি কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এর ফাঁকে তন্ত্র-মন্ত্র ও যাদু বিদ্যা-কবিরাজীতে মনোযোগ দেন এই চাল ব্যবসায়ী। আবু তাহের তার বড় ছেলে ইউসুফের সঙ্গে এনিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এই দু:খে বাড়ি ছাড়েন তিনি। লাহিড়ী হাট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন তাহের। তার সঙ্গে থাকতেন ছোট ছেলে মেহেদী ও স্ত্রী হুসনে আরা। লাহিড়ীতে থেকে তিনি অসুস্থ হন।পরে রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার(তাহেরের) মৃত্যু হয়।

গ্রামের আফরোজা বেগম বলেন, আবু তাহের মৃত্যুর আগে পরিবারের সবাই কে বলেছিলেন। তার মৃত্যুর পর বাড়িতে গরু মাংস দিয়ে মিলাদ-মাহফিল না করতে। এটা না মানায় বেসহুরীর অবতার ঘটায় একই পরিবারের ৫জনের মৃত্যু হয়েছে। কেউ বলছেন, ইউসুফের শ্বশুর রবিউলের সঙ্গে এই পরিবারের দন্দ ছিল। তার জের ধরে এই ঘটনা ঘটল কিনা তা’ খতিয়ে দেখতে দাবি উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে বালিয়াডাঙ্গী থানা ওসি মোসাবেবরুল ইসলাম বলেন মৃত পরিবারের রেখে যাওয়া সম্পতি থেকে স্বামী হারা কোহিনুর ও শিশু আবিরকে বঞ্চিত করতে এ ধরণের প্রশ্ন তুলছে নিকট আত্মীয়রা ।

লাহিড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুদ করিম বলেন তাহেরের ছেলে ইউসুফ তার ছাত্রী কোহিনুর বিয়ে করেছিলেন। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। শেফালি বেগম বলেন, আবু তাহেরের মরদেহ গোছল করার সময় গ্রামবাসীরা বাড়ির আঙ্গিনায় সাপ দেখতে পান। এটিকে অনেকে দেবতা মনে করছেন। কেউ বলছেন আবু তাহের তার বাড়ির একটি কক্ষ সব সময় তালা বন্ধ করে রাখতেন। এ কক্ষে তিনি তন্ত্রমন্ত্র আয়ত্ব করতেন। পরে তিনি কক্ষে তালা দিয়ে রাখতেন। তার মৃত্যুর পর মেয়ে জামাই হাবিবুর তালা খুলে ওই কক্ষে ঢুকতে গেল একটি কাল বিড়াল দেখতে পান। এতে ভয় পান হাবিবুর। এর পর তিনি অসুস্থ হন এবং একদিন পর মারা যান।

এই খবর শোনে তার শ্বাশুড়ী হুসনে আরার আকস্মিক মৃত্যু হয়। এ ভাবে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায় জানান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সমর কুমার চ্যার্টাজী। এই জনপ্রতিনিধি বলেন মৃত আবু তাহের অনেক দিন আগে ঠাকুরগাঁও শহরের বড়মাঠে সাপ খেলা দেখেছিলেন। এই থেকে তন্ত্রমন্ত্রের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

অজ্ঞাতরোগে ঠাকুরগাওঁয়ে এক পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় সেখানে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষক দলের টিম লিডার প্রধান ডা. মো. গাজী শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, তত্ব ও উপাত্ত এবং নমুনা সংগ্রহ শেষে পরীক্ষা নিরীক্ষা পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে এটি আসলে কি? ১৫ দিনের ব্যবধানে অজ্ঞাত রোগে একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা নজরে আসে আইইডিসিআরের। তারা এরমধ্যেই সেখানে তাদের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দলকে পাঠায়।

বধুবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঠাকুরগাঁওয়ের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা.শাহজাহান নেওয়াজ বলেন, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাঁচ সদস্যের তদন্ত টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেছেন। রাজশাহী থেকে আরেকটি মেডিকেল টিম একই উদ্দেশ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে আসছে। দুটি মেডিকেল টিমই ঠাকুরগাঁওয়ে তিনদিন অবস্থান করবে। তাদের সংগৃহিত নমুনা ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানোর পর জানা যাবে প্রকৃত ঘটনা ।

এর আগে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক কে.এম কামরুজ্জামান সেলিম, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ, বালিয়াডাঙ্গী থানা ওসি মোসাব্বেরুল ইসলাম সহ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ঘুরে আসেন ।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন মরিচপাড়া গ্রামের মানুষের ভয় কেটেছে । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়েছে। আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। মেডিক্যাল রির্পোট হাতে এলে জানা যাবে প্রকৃত ঘটনা বলে জানান উপজেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা।

Print Friendly, PDF & Email

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ঠাকুরগাঁও বিভাগের সর্বশেষ
ঠাকুরগাঁও বিভাগের আলোচিত
ওপরে