২৬শে মে, ২০১৯ ইং ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
সদরঘাট জিম্মি ‘খলিফা বাহিনী’র হাতে কৃষকের ঘরে বিয়ের ১১ বছর পর এক সঙ্গে চার সন্তান বাংলাদেশীদের পদচারণায় জমজমাট কলকাতার ঈদ বাজার! স্বামী সন্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের... হঠাৎ কোটিপতি হয়ে যাওয়া এক নেতা

“ভারতীয় মেয়ে অরুণিমা সিনহার সাফল্যের কথা”

 অনলাইন ডেস্কঃ সমকাল নিউজ ২৪

দিনটা ছিল ২০১১ সালের ১২ই এপ্রিল। বাইশ বছরের মেয়েটা লক্ষনৌ থেকে পদ্মাবতী এক্সপ্রেসটাতেই, রাতে উঠেছিল দিল্লী যাবে বলে। রাতের ট্রেনেই দিল্লীতে,তার যাওয়াটা অত্যাবশ্যক তাই খুবই তাড়াহুড়োয় সে একাই চলেছে।

 

মনে তার চাপা আনন্দ। CISF এ চাকরিটা এবার বোধ হয় হয়েই যাবে। আর হবে নাই বা কেন? জাতীয়স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় সে, সেসঙ্গে ফুটবলটাও তো খেলে মাঝে মাঝে, স্পোর্টস কোটায় অনেকদিন আগেই তার তো চাকরিটা হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল, এখনো যে হয়নি কেন এটাই আশ্চর্যের।

 

তো মেয়েটা যখন লক্ষনৌ থেকে ট্রেনে উঠল তখন রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ ইন্টারভিউয়ের চিঠি আসায় আর তাড়াহুড়োয় রিজার্ভেশন কিছুতেই পাওয়া যায়নি, তাই মেয়েটা কোনোরকমে জেনারেল কামরায় একটু আধটু জায়গা পেয়েই চুপ করে বসেছিল। ঘুমোলে চলবে না, সঙ্গের ব্যাগে টাকাপয়সা, রেজাল্ট, খেলার সার্টিফিকেট সবই আছে।

 

তবুও একনাগাড়ে বসে থাকলে সবারই ঝিমুনি আসবে। তারওপর রাতের ট্রেনগুলো সব এমনিতেই তো জোরে চলে। ফলে পদ্মাবতী এক্সপ্রেসটাও যখন চেনাতি ষ্টেশন থেকে জোরে হুইসল বাজিয়ে রওনা দিল, মেয়েটা ঘুমেই প্রায় ঢুলে পড়েছে পাশের দেহাতী মহিলাটির কাঁধটাতে। সারাদিন মাঠে প্র্যাকটিস করে এমনিতে ক্লান্ত ছিল, তার ওপর জানলা দিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া, ঘুম তো আসতে বাধ্য হবেই, তাইনা !!

 

কামরার অন্য লোকেরাও ঝিমোচ্ছে। কেউবা তখনোও জেগে আছে, হাই তুলছে ঘনঘন।

 

মেয়েটা একটা ব্যাপার বুঝতে পারেনি, ও যেখানে বসে আছে তারচেয়ে কয়েকহাত দূরে, তিনজোড়া চোখ ওর ওপর সমানে নজর রাখছে। একা সোমত্ত মেয়ে রাতের সাধারণ কামরায় বিরল তো বটেই, তবে তার সবচেয়েই বেশি যেটা, ওই চোখগুলোকে আকর্ষণ করছিল, সেটাই হল মেয়েটার গলায়, ট্রেনের দুলুনিতে মৃদুমন্দ দুলতেও থাকা আর চকচক করা, ঐতো ঐ খাঁটি সোনার হারটা। টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

 

লোকতিনটে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল আর তারা যখন বুঝল মেয়েটা অকাতরে ঘুমোচ্ছে, ক্লান্ত চোখদুটো একদম বোজা, নিঃশ্বাস পড়ছে একলয়ে, তখন একজন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।

 

মেয়েটা বসেছিল লোয়ার বার্থের একদম কোণার পাশে, লোকটা কিছুই হয়নি এমনই ভাব করে, বাথরুমে যেতে যেতে একটুও না ঝুঁকে অভিজ্ঞ হাতটা রাখল মেয়েটার গলায়।

 

কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড। তারপরেই হেঁচকা একটা টান মেরে ছিঁড়ে নিল হারটা।

 

পরিকল্পনাটা ছিল, লোকটা হারটা ছিনিয়ে নিয়েই, যেন বাথরুমের দিকে চলে যাবে, আর সেটা মেয়েটা বা অন্য কেউ দেখে ফেলার আগেই বাকি দুজন গিয়ে পরিস্থিতি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে।

 

কিন্তু প্ল্যানমাফিক ব্যাপারটা এগোল না। মেয়েটার গলা থেকে হারটা ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার তো ঘুমও ভেঙে গেল, মুহূর্তে কি হচ্ছে বুঝতেও পারল, হাত দিয়েই লোকটার কাছ থেকেও হারটা টানতে শুরু করল তখনই মেয়েটা।

 

মুটকো লোকটা পরিস্থিতিটা বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি অবস্থাতেই টানতে টানতে বাথরুমের দিকে চলল। বাকি দুজন লোকও এগিয়ে আসতে লাগল। মেয়েটাও ছাড়ার বান্দা নয়, হারটাও তার সর্বস্ব, সে হ্যাচড়াতে হ্যাচড়াতেই লোকটার সঙ্গে যেতে লাগল, সঙ্গে মুখে চিৎকার করতে লাগল, “চোর! চোর! বাঁচাইয়ে মুঝে!”

 

অদ্ভুত ব্যাপার! মেয়েটার তারস্বরে চিৎকারে যারা তখন জেগেছিল তারা সবাইও সচকিত হয়ে উঠলই, কামরায় যারা ঘুমোচ্ছিল, তারাও ধড়মড়িয়ে উঠল। কিন্তু তিনটে লোকের সঙ্গে একটা মেয়ে একা লড়ে যাচ্ছে দেখেও যে তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তারা শুধুই নিজেদের চোখগুলো দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দৃশ্যটা যেন, গিলতে লাগল।

 

একজনও এগিয়ে এল না।

 

ওদিকে মেয়েটাও লোক তিনটের সঙ্গে, ধস্তাধস্তি করতে করতে বাথরুমের আগের ফাঁকা জায়গাটায় এসে পড়ে, ট্রেনটা ততক্ষণেই বেরিলির কাছাকাছি এসে গেছে, হু হু করে হাওয়া ঢুকছে খোলা দরজা দিয়েই।

 

মেয়েটার হাতদুটোই মুচড়ে ধরেছিল একটা লোক আর সেই অবস্থাতেই একটা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে প্রাণপণে ঘুষি চালাল লোকটার মুখে। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় লোকটা ওর পেটে প্রচণ্ড জোরে ঘুসি চালালে মেয়েটা আঘাতের তীব্রতায় মেয়েটার নাকমুখ কুঁচকে গেলেও সে ততক্ষণে মেয়েটা যে দাঁতের বসিয়ে, রক্তাক্ত করে দিয়েছে তৃতীয় লোকটার হাত,চামড়া ছিঁড়ে মাংস দেখা যাচ্ছে সেখানে।

 

মিনিট তিনেকের মধ্যেও লোকগুলো যেন প্রমাদ গুণল। বেরিলি ষ্টেশনে আর কিছুক্ষণের মধ্যে ঢুকবে ট্রেন, এই মেয়ে তো সহজে ছাড়ার বান্দা নয়! কিল-চড়-ঘুসিতেও ঠাণ্ডা হচ্ছে না যে!

 

লোক তিনটে একঝলক নিজেদের মধ্যেও, চোখাচোখি করল, তারপরেই চোখ বুলিয়ে নিল, কামরার ভেতরের দিকে। সেখানে তখনো অন্তত ত্রিশজোড়া চোখই এদিক পানেও উৎসুক নয়নে চেয়ে আছে, কিন্তু কারোর কোনই বক্তব্য নেই। নাহ্ ¡ এদের নিয়ে চাপ নেই তাদের ভিতরে।

 

যে লোকটা হারটা প্রথম ছিঁড়তে গিয়েছিল, সে নিজের ঠোঁটটা চেটে নিল একবার, মেয়েটার দুটো হাতই পেছন দিকে চেপে ধরা আছে, তবু সে পা দিয়ে লাথি কষিয়েই যাচ্ছিল তখনও ।

 

প্রথম লোকটা তখন ইশারা করতেই প্রায় আলোর গতি বেগে লোক তিনটে ছুটে গেল দরজার দিকে, তারপর হু হু গতিতে ছুটতে থাকা ট্রেনটা থেকে, পোড়া সিগারেটের টুকরো ফেলার মত ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইশ বছরের, ওই জাতীয় স্তরে ভলিবল খেলা মেয়েটাকে।

 

মুহূর্তে একরাশ কালো শূন্যতা। অন্ধকার হয়ে গেল এক সোনালী ভবিষ্যৎ। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল অনেক স্বপ্ন।

 

মেয়েটা ছিটকে পড়ল পাশের রেললাইনের ট্র্যাকে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়তির টানে যেন সেই লাইনেও, ছুটে এল আরেকটা ট্রেন। ওর বাঁ পা’টা ট্রেনটা থেকে পড়েও আগেই ভেঙে গিয়েছিল, এবার তার ওপর দিয়ে, ট্রেনটা ছুটে গিয়ে বড় থেকে ছোট, সবরকম হাড়গুলো ধুলোর মত গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিল। তলপেটের আঘাতে, আগে থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল, এখন প্রচণ্ড আঘাতেই চিড় ধরল তলপেটের নীচের হাড়গুলোতেও। কোমরের প্রধান হাড়টাও মড়মড়িয়ে ভেঙে গেল।

 

একটা অমানুষিক কষ্ট সহ্য করতে করতে মেয়েটা জ্ঞান হারাল।

 

কি ভাবছেন? কষ্টে মুচড়ে উঠছে মন? রাগ হচ্ছে কি ওই কামরার নীরব দর্শকগুলোর প্রতি?

 

দাঁড়ান না !! গল্পটা তো এখনো শেষ হয়নি … …
:
:
২০১১ থেকে এবার সোজা চলে আসুন ২০১৯ সালেরই ৩,জানুয়ারিতে !! হ্যাঁ হ্যাঁ,গত ৩,জানুয়ারিতেই, সেই ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া মেয়েটাই, অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসনও জয় করেছে,বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউইটি হিসেবে।

 

হ্যাঁ, এই ভারতকন্যার নাম “#অরুনিমা_সিনহা” ।

 

অরুণিমা ২০১৩ সালেই মাউন্ট এভারেস্টটাও জয় করে ফেলেছে, তার একটা পা প্রোস্থেটিক, অর্থাৎ অ্যাম্পিউট করা। আর বাকি শরীরটা অজস্র জায়গায় ভাঙা।

 

একরাতেরই মধ্যে সে যখন, জাতীয় স্তরেরও খেলোয়াড় থেকে প্রতিবন্ধীতে পরিণত হয়েছিল, আশপাশের সকল মানুষগুলোর চোখে ফুটে উঠেছিল বেদনা আর হতাশা।

 

আহা! এমন মেয়েটা শেষ হয়ে গেল!

 

সেই করুণা অরুণিমা নিতে পারেনি। কারোর করুণারই পাত্রীও নয় সে। সেই ভয়াবহ ঘটনার পরেই, মাসকয়েক হাসপাতালে থেকেও, সে যখন ছাড়া পেয়েছিল, তারপর থেকেই শুরু করে দিয়েছিল বিরামহীন ট্রেনিং। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউটি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে সে চমকে দিয়েছিল সবাইকে।

 

তো সে এই ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যেই শুরু করে দিয়েছে নিজের সংস্থাটা, অরুণিমা ফাউন্ডেশন থেকে,যারা দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলায় প্রেরণা জোগায় ও সাহায্য করে। ২০১৫ সালে সে পেয়েছে পদ্মশ্রী, সংবর্ধিত হয়েছে দেশে ও বিদেশে।

 

গত ৩,জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয় করার পরে,সে জানিয়েছে পৃথিবীর আরো সব, উঁচু শৃঙ্গগুলো সে জয় করতে চায়। চূড়ায় উঠেই সে বলতে চায়, “দ্যাখো আই অ্যাম অন দ্য টপ!”

আরও পুড়ুনঃ  বাদ নয়, নিজেই মন্ত্রিত্ব নেননি নাহিদ!

সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায় হতাশা, অসম্ভব, শেষের মতই শব্দগুলোকে। পাল্টে দিতে চায় সেই মানুষগুলোর সবই ধারণাকে যারাই ভেবেছিলেন, ও চিরকালেরও মত শেষ হয়ে গেছে।

 

আসুন মন থেকেই শুভ কামনা জানাই আর গর্বিত হই, এই ক্ষণজন্মা ভারতীয় মেয়েটার জন্যে।

 

এইজয় সে উৎসর্গ করেছে তার সবচেয়ে শ্রদ্ধার ব্যক্তিত্ব স্বামী বিবেকানন্দকে।

 

বিনোদন জগতের সব সামান্য মুচমুচে, খবরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি কিন্তু এই ধরণের যোগ্য সত্যিকারের হিরো, হিরোইনদেরই, আমরা কজন চিনি? কজন জানি?

 

অরুণিমার মতই আরোসব হিরোইনগুলো উঠে আসুক, সমস্ত নেগেটিভিটিকে হেলায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে জয় করুক তারা স্বপ্ন, এমনই আশা রইল।

 

যারা প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রামে,পরীক্ষায়, বা সামাজিক সমস্যায় হতাশ হয়ে পড়েন, তাঁদের মনেও কিন্তু কোন না কোন, এককোণে অরুণিমা সিনহা লুকিয়ে রয়েছে।

 

দরকার শুধু তাকে মন থেকে বের করে আনার … … …

লেখকঃ ড. এম এ এমরান খান, প্রফেসর, পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ

Print Friendly, PDF & Email

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে