২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
ই’য়াবা সহ আটক-১ মহাদেবপুর-ছাতড়া সড়ক খানাখন্দে ভরা; দূর্ভোগ চরমে বগুড়ায় স্বেচ্ছাসেবকদলের ৩৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন সাংবাদিক ইকবাল হোসেনের শ্বশুরের ইন্তেকালে শোক প্রকাশ দুর্গাপুরে মা সমাবেশ

রোবট বানায়, রোবট শেখায় ওরা

 অনলাইন থেকে সংগ্রহ, সমকাল নিউজ ২৪

আহ্‌ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর ধ্যান-জ্ঞান রোবট। আর রোবটকে নিজেদের বশে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ১৪ শিক্ষার্থী মিলে তৈরি করেছেন ‘থ্রাস্ট’ নামে একটি দল। থ্রাস্টের পথচলা নিয়ে লিখেছেন হাসান জাকির ও তৌহিদুল ইসলাম তুষার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, বিগ ডাটা এবং রোবটিক্স এখন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নতুন ক্রেজ। দেশের তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন প্রযুক্তির এ নতুন দুনিয়ায়। প্রযুক্তির এ নতুন ক্রেজ থেকে রোবট নিয়ে কাজ করছেন আহ্‌ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) এবং তড়িৎ প্রকৌশল (ট্রিপলই) বিভাগের ১৪ শিক্ষার্থী মিলে তৈরি করেছেন ‘থ্রাস্ট’ নামে একটি দল। দলটির আগ্রহ, চিন্তা কিংবা স্বপ্ন পুরোটাই রোবটকে ঘিরে। ওরা রোবট বানায়, ওরা রোবট শেখায়।

গত শনিবার সমকাল কার্যালয়ে আসেন থ্রাস্টের কয়েকজন সদস্য। তারা টেকলাইনকে শুনিয়ে যান তাদের স্বপ্নের কথা আর স্বপ্নকে বাস্তবে ধরার সংকল্পের কথা। থ্রাস্টের দলনেতা সিএসই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহসীন হক শোনান তাদের পথচলার গল্প। রোবট নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে থ্রাস্টের মাধ্যমে একসঙ্গে পথ চলা শুরু করেন এই ১৪ শিক্ষার্থী। এখন তাদের ধ্যান-জ্ঞানই যেন রোবট। থ্রাস্ট যে শুধু নিজেরাই রোবট বানায় এবং শেখে এমনটি নয়; তারা রোবট বানোনোর জারিজুরি ফাঁস করতে হাজির হয় খুদে শিক্ষার্থীদের স্কুলে। শুধু কি তাই, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও কর্মশালা আয়োজন করে রোবট বানানো শেখায় ওরা। এ সম্পর্কে মোহসীন হক বলেন, ছোট-বড় সবারই আগ্রহ আছে রোবট সম্পর্কে। রোবট কী এটা আর জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, চাইলেই যে কেউ বানাতে পারবে রোবট- আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে চাই। মোহসীন হকের সঙ্গে যুক্ত করে তার বন্ধু অর্ঘ্য অর্পণ বলেন, রোবট বলতে আমরা বুঝি মানুষের মতো আকৃতির কেউ একজন সামনে হাঁটবে-ঘুরবে-ফিরবে। বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। নানা ধরনের, নানা কাজের রোবট হতে পারে। কোনোটা হতে পারে বর্গাকৃতি, কোনোটা মোটা, কোনোটা চ্যাপ্টা। মূলত কাজের ক্ষেত্র অনুযায়ী রোবটের ডিজাইন হয়ে থাকে। ফলে রোবট বলতে মানুষের আকৃতি হবে এমন প্রচলিত ধারণা কিন্তু ভুল। কার্টুন এবং সিনেমা দেখে বিশেষ করে খুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। আমরা এ ধারণা ভেঙে দিতে বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।

থ্রাস্টের সদস্যরা

থ্রাস্ট দলে মোহসীন হক আর অর্ঘ্য অর্পণ ছাড়াও রয়েছেন সহল ইসলাম, ফরহাদ উজ জামান, তামজীদ ইসলাম, নিয়াজ মাহমুদ সায়েম, হুমায়রা আলম তাবাসসুম, আশফাকুর রহমান ফাহিম, রাকিব হোসেন রিফাত, ফাহিম খান, আরমান সরকার, সাইমুম ইসলাম, দিব্য নাথ ও মো. রিদওয়ান হাসান। সদস্যদের মধ্যে নিয়াজ মাহমুদ সায়েম ও সহল ইসলাম পড়ছেন তড়িৎ প্রকৌশলে আর বাকিরা কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে। কম্পিউটার কিংবা তড়িৎ প্রকৌশলে পড়লেও দলের সবাই যে একই ধরনের কাজ করেন তা কিন্তু নয়। উপস্থাপনায় দক্ষ হওয়ায় প্রশিক্ষণ উপস্থাপনা এবং দলের নেতৃত্বের ভার যেমন পড়েছে মোহসীনের ওপর, তেমনি কেউ গ্রাফিক্সের কাজ করেন, কেউ রোবটের বেসিক নিয়ে কাজ করেন কেউ প্রোগ্রামিংয়ে জোর দেন- এভাবেই একটা দল হয়ে ওঠে থ্রাস্ট।

রোবট শেখায় ওরা

তবে কঠিন এই কাজটি শিশুদের উপযোগী করে তৈরি করছে থ্রাস্ট। চেষ্টা থাকলে স্কুলপড়ূয়া শিক্ষার্থীরাই তৈরি করতে পারবে রোবট। রোবট বানানোর সহজ কিছু কৌশল শেখাতে বিভিন্ন স্কুলে হাজির হচ্ছে থ্রাস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা আর্ডিনো বা মোটর ড্রাইভার- এগুলোর নাম শোনে।

এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে করতেই প্রায় দুই বছর পার হয়ে যায়। রোবটিক্সের কিছু টার্ম রয়েছে খুব সহজ, যা স্কুলেই শিখতে পারি। এমনই চিন্তা থেকে স্কুল কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মোহসীন হক জানান, আমরা শুধু রোবট বানাব আর খ্যতি অর্জন কিংবা ভালো চাকরি করব- আমাদের লক্ষ্য সেটি নয়। আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলপড়ূয়া শিক্ষার্থীদের মাথায় রোবট ঢুকিয়ে দিতে চাই। রোবট বানানো যে আহামরি কিছু নয়; এ বার্তাটি আমরা খুদে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। এজন্য রোবট কীভাবে বানাতে হয়, রোবট তৈরির যন্ত্রাংশ কোথায় পাওয়া যায়, দাম কেমন এসব বিষয়ে খুদে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকি। ইতিমধ্যে আমরা ঢাকার বাইরে কয়েকটা স্কুলে কর্মশালা পরিচালনা করেছি। নিজেদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নিয়াজ মাহমুদ সায়েম বলেন, আমরা যখন কোনো স্কুলে গিয়ে আমাদের বানানো রোবট ওড়াই, তখন শিক্ষার্থীরা তো বটেই, শিক্ষকরাও গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখে। তারা আনন্দ পান। এরপর ওই শিক্ষার্থীদের আমরা হাতে-কলমে দেখাই এ ধরনের রোবট কীভাবে তৈরি করতে হয়, এ রোবট তৈরি করতে গেলে কী শেখা লাগে। রোবট নিয়ে কেউ আগ্রহী হলে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে এ বিষয়গুলো আমরা উপস্থাপন করি।

অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের জীবনের লক্ষ্য জানাতে গিয়ে বলে, ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু প্রশ্ন করা হয় যদি, কী ধরনের ইঞ্জিনিয়ার হবে সেটি আর বলতে পারে না। এই জায়গাটিতে আমরা ফোকাস করছি। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ভাবনাকে আরও সুগঠিত করতে চাই আমরা। পাশাপাশি ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখবে কিংবা সাইবার স্পেসে সুরক্ষিত থাকবে এ বিষয়েও কর্মশালায় আলোচনা করি আমরা। তবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনে কোনো রকম আর্থিক সুবিধা নেয় না থ্রাস্ট। মূলত ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্যই কর্মশালা আয়োজন করে থাকে সংগঠনটি। চাইলে যে কোনো স্কুল আমন্ত্রণ জানালে, থ্রাস্টের কয়েকজন সদস্য বিনামূল্যে নিজেদের অর্থ খরচ করে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসবেন। তবে শুধু থাকার ব্যবস্থা করে দিলেই হবে। শুধু কি ছোটদের জন্য? তা নয়। স্কুুলের শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছে, তেমনি বড়দের জন্য আয়োজন করছে ড্রোন কর্মশালা। অর্ঘ্য অর্পণ বলেন, ড্রোন বানানো রোবটিক্স থেকে একটু কঠিন। আর এজন্য দরকার কারিগরি জ্ঞান। এ বিষয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয় ওরা। ইতিমধ্যে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ড্রোন বানানো বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেছে থ্রাস্ট। অচিরেই আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কর্মশালা করবে তারা।

রোবট বানায় ওরা

রোবট নিয়েই যাদের ধ্যান-জ্ঞান তারা শুধু প্রশিক্ষণ দেবে এমনটি ভাবলে ভুল হবে। ওরা শুধু রোবট বানানো শেখায়ই না, নিজেরাও রোবট বানায়। থ্রাস্ট ইতিমধ্যে তৈরি করেছে রোবট ক্লিনার। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘর পরিস্কার করবে।

এ ছাড়া সামনে কোনো বস্তু থাকলেও সেটা সরিয়ে পরিস্কার করবে রোবট। থ্রাস্ট যে ড্রোন বানিয়েছে সেটি ১.৫ কিলোমিটার দূরত্বেও সক্রিয় থাকতে পারে। ‘স্পাই রোবট কিংবা লাইন ফলোয়ার রোবট, ব্লুটুথ কন্ট্রোলার কার, ল্যাঙ্গুয়েজ ডিটেক্ট প্রভৃতি ডিভাইস তৈরি করেছে তারা। লাইন ফলোয়ার রোবট নির্দিষ্ট পথ ধরে এগোতে থাকে। ব্লুটুথ কন্ট্রোলার কার সম্পূর্ণভাবে সেলফোনে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ল্যাঙ্গুয়েজ ডিটেক্ট নামের রোবটটি বাকপ্রতিবন্ধীদের কথোপকথন সাধারণ মানুষকে বোঝার জন্য শব্দে রূপান্তর করে দেয়। তবে সাধ থাকলেও সাধ্য না থাকায় ব্যয়বহুল রোবট নিয়ে কাজ করতে পারেন না থ্রাস্টের সদস্যরা। কেননা নিজেদের হাতখরচ বাঁচিয়ে চাঁদা তুলে এক একটা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেন ওরা।

প্রতিযোগিতায় থ্রাস্ট

দলটি এ পর্যন্ত জিতেছে চারটি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি। এর মধ্যে রয়েছে ‘বুয়েট আই ট্রিপলই ২০১৮’, ‘আইএপি প্রজেক্ট শো ২০১৮’, ‘ইনোভেঞ্চার ২০১৭’ এবং ‘ইনজিনিয়াস ২০১৭’। এ ছাড়া ‘ডিআরএমসি লাইন ফলোয়ার রোবটিক কম্পিটিশন’ এবং টেকমেনিয়া লাইন ফলোয়ার রোবটিক কম্পিটিশনে ফার্স্ট রানার্সআপ ট্রফি জিতেছে ওরা।

আগামীর স্বপ্ন

রোবটিক্স নিয়ে নানা পরিকল্পনা রয়েছে থ্রাস্টের। দেশজুড়ে রোবট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভীতি দূর করতে বড় পরিসরে কাজ করতে ইচ্ছুক থ্রাস্ট। এজন্য আগামী বছরের শুরুতে ‘থ্রাস্ট রোবটিক স্কুল’ নামে সম্পূর্ণ অনলাইন পল্গ্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে তারা। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই আগ্রহীরা অনলাইনেই রোবট বিষয়ে খুঁটিনাটি শিখতে পারবেন, জানতে পারবেন। এখানে থাকবে অনেক টিউটোরিয়াল, যা দেখে যে কেউ শিখতে পারবেন রোবট বানানোর কৌশল।

এছাড়া যারা রোবট বিষয়ে আরও দক্ষ হতে চান, তারা এমন রোবট তৈরির স্বপ্ন দেখেন, যা জাতীয় জীবনে বিপদে এবং প্রয়োজনে সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবে। আর সে স্বপ্ন পূরণের পথেই এগিয়ে চলেছে থ্রাস্ট।

Print Friendly, PDF & Email

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে