২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
বরগুনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে... নিজ দায়িত্বে শহর ও গ্রামকে পরিষ্কার না রাখলে মোবাইল... কোটচাঁদপুরে হেলমেট ছাড়া মিলবে না বাইকের তেল উজিরপুরের নারী নি’র্যাতনকারী সেই ওসি ও কনস্টেবলের... বালিয়াডাঙ্গীতে প্রাথমিক শিক্ষকদের ০৭ দফা দাবিতে...

লাভের আশায় যে পেশায় লোকসান হয়, কি হবে সে পেশায় থেকে!

  সমকালনিউজ২৪

হায়াতুজ্জামান মিরাজ, আমতলীঃ
এনজিও থেকে লোন নিয়ে, ধার দেনা করে বীজ সার কিনে, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে ফসল ফলিয়ে যখন ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না তখন কৃষক পরিবারে হ’তাশা ভর করে। ধান রোপনকারী কৃষকরা জানান, ১ একর জমিতে ধান চাষাবাদ করতে জমি তৈরী, বর্গামূল্য, চাষাবাদ, নিড়ানি, কী’টনাশক, শ্রমিক মূল্য ও বীজমূল্যসহ একর প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ মন। যার বাজার মূল্য ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা। সে হিসেবে ঐ জমির ধান বিক্রি করে কৃষক পাচ্ছে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

এতে একর প্রতি কৃষকদের লোকশান হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। কৃষকরা আক্ষেপ করে বলেন “লাভের আশায় যে পেশায় লোকশান হয়, কি হবে সে পেশায় থেকে”!

আমতলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখাগেছে একই দৃশ্য। কৃষকের মলিন মুখ। ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দাঁড়াতেই বেদনা ভাড়াক্রান্ত কন্ঠে বলা শুরু করলো বাজারে ধানের দাম নিয়ে তাদের হ’তাশার কথা। অনেক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, লাভের আশায় যে পেশায় লোকসান হয়, আগামীতে আর তারা সে পেশায় থাকবেন না। অর্থাৎ তারা আর ধান চাষ করবেন না। প্রয়োজনে তারা দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালাবেন। তবুও আর ধান চাষ করবে না। অনেক কৃষক আবার রাগে ক্ষোভে ধান কাটতেছেন না। মাঠে পড়ে রয়েছে পাঁকা ধান।

কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলেও মধ্যসত্বভোগীরা ধান বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে বলে এমন অ’ভিযোগ করছেন উপজেলার অধিকাংশ কৃষকরা। তাদের দাবী ধানের বাজার ধরে রেখে কৃষকদের বাঁচাতে না পারলে ভবিষৎতে পাট ও চামড়া শিল্পের মত কৃষি শিল্পও শেষ হয়ে যাবে।

এ নিয়ে কথাহয় আমতলী সদর ইউনিয়নের ছুড়িকাটা গ্রামের দরিদ্র কৃষক আফজাল হোসেনের সাথে তিনি ক্ষোভ মিশ্রত কন্ঠে বলেন, ১ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৮’শ টাকা। একজন দিন মজুরের খরচ যেখানে ৭’শ টাকা সেখানে ধানের মন ৪২০ টাকা। কি করবো ধান চাষাবাদ করে। এজন্য বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান সবাই মিলে ধান কাঁটতে নেমেছি।

চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী গ্রামের কৃষক সোবাহান হাওলাদার বলেন, লাভের আশায় স্থানীয় একটি এনজিও থেকে লোন নিয়ে ১৩ বিঘা জমিতে ধান চাষাবাদ করেছি। জমি চাষ করে ১৩০ মন ধান পেয়েছি। এ জমিতে ধান রোপনসহ আনুসাংঙ্গিক মোট খরচ হয়েছে ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি মন ধান ৪৫০ দাম টাকা দরে বিক্রি করেছি। বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিভাবে এনজিওর লোন শোধ করবো তা ভেবে পাচ্ছিনা।

হলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বচিলা গ্রামের কৃষক ঝন্টু তালুকদার, লিমন হাওলাদার, হানিফ তালুকদার আক্ষেপ করে বলেন, লাভের আশায় যে পেশায় ক্ষতি হয় আগামীতে আর সে পেশায় থাকবো না। প্রয়োজনে জমি খিল (চাষাশূন্য) থাকবে তবুও আর ধান চাষ করবো না।

কুকুয়া ইউনিয়নের মহিষকাটা গ্রামের কৃষক নাসির উদ্দিন খান বলেন, আমি এ বছর ৭ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষ করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। ৭ বিঘা জমিতে ৫২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে ধান পেয়েছি ৭০ মন। যা ৪৫০ টাকা মন দরে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি করেছি। আমার লোকসান হয়েছে ২০ হাজার টাকা।

আমতলী ইউনিয়নের কৃষক আঃ ছালাম প্যাদা বলেন, গত বছর ৩ একর জমিতে ধান রোপন করে অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। এ বছরও একই জমিতে আউস ধান রোপন করেছি। উৎপাদনও ভাল হয়েছে। এখন বাজারে ধানের দাম কম ও ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছিনা।

ঘটখালী গ্রামের রিক্সা চালক কৃষক সোহাগ হাওলাদার জানান, তার ৫০ শতাংশ জমিতে ধান চাষাবাদ করে ১৫ মন ধান পেয়েছেন। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় বিক্রি করতে পারছি না।

আঠারোগাছিয়া গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক আঃ খালেকের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও তার পুত্র ইমন (১১) ধানের বোঝা নিয়ে বাড়ীর দিকে যাচ্ছে। ধানের বোঝায় নুয়ে পড়ছে তাদের পিঠ। কান্না জড়িত কন্ঠে খালেক বলেন, “বাজারে কাউমলার (কামলা) দাম বেমালা, হেইর লইগ্যা মুই ধান কাডি আর মোর বউ পোলা মিল্লা হেই ধান বাড়তে টাইন্যা লইয়া যায়”।

আমতলীর ধান- চালের আড়ৎদার মোঃ জহিরুল ইসলাম মিলন মৃধা বলেন, প্রতি বছর উত্তর ও দক্ষিনাঞ্চলের মিল মালিকরা আমাদের মাধ্যমে ধান ক্রয় করতো। এ বছর তারা এখনো ধান ক্রয় করা শুরু করেননি।

আমতলী ধান-চাল আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাকির হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে প্রকারভেদে ধানের মূল্য মন প্রতি ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা। অটো রাইসমিল মালিকরা ধান ক্রয় করছেন না। এ কারনে বাজারে ধানের দাম কমে গেছে ও কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েছে।

আমতলী উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ রেজাউল করিম মুঠোফোনে বলেন, এ বছর আমতলী উপজেলায় ১১ হাজার ৭’শ ৬০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্জিত হয়েছে ৮ হাজার ৯’শ ৯০ হেক্টর। ধানের উৎপাদন ভাল হলেও বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকরা লোকসানের মধ্যে পড়েছেন।

সরকার ও কৃষি সংশ্লিষ্ট উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে কৃষকরা দাবী করে বলেন, কৃষকদের কষ্টটা বুঝতে চেষ্টা করুন। জমি চাষাবাদ করে ফসল ফলিয়ে সেই ফসলের যেন ন্যায্য মূল্য কৃষকরা পায় তার ব্যবস্থা করুন। কৃষি সেক্টরে যে সমস্ত সিন্ডিকেট আছে তা ভেঙ্গে দিয়ে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে দিন। অন্যথায় কৃষকরা আর কৃষি কাজ করবেন না বলে তারা জানান।

বিদ্রঃ সমকালনিউজ২৪.কম একটি স্বাধীন অনলাইন পত্রিকা। সমকালনিউজ২৪.কম এর সাথে দৈনিক সমকাল এর কোন সম্পর্ক নেই।’

 

 

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
বরগুনা বিভাগের সর্বশেষ
বরগুনা বিভাগের আলোচিত
ওপরে