২১শে মে, ২০১৯ ইং ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
যাকাত দিলে সম্পদ বাড়ে ! ব্রীজ মেরামতে সময় ক্ষেপন তালতলী উপজেলা সদরের সাথে সারা... জামালপুরের দেওয়ারগঞ্জ পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে মামলার... বগুড়ায় গ্যাস ট্যাবলেট সেবনে কাকি ভাতিজা আত্মহত্যা ! বরগুনায় বশতঘর নির্মানে বাধা” ৩ লক্ষ্য টাকা চাদাঁদাবীর...

শিক্ষায় রাজনীতি অধঃপতনের মূল সোপান?

 অনলাইন ডেস্কঃ সমকাল নিউজ ২৪
শিক্ষায় রাজনীতি অধঃপতনের মূল সোপান?

বাংলাদেশে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব জায়গায় সাধারণ মানুষের আলোচনার প্রধান একটি বিষয় হলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান৷ এশিয়ার সেরা ৪০০টির মধ্যে নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়৷ এর কারণ কী?

‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ নামের লন্ডনভিত্তিক একটি ম্যাগাজিন এশিয়ার সেরা ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে৷ এই তালিকা তৈরিতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি- এই চারটি মৌলিক বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে৷ আর তাদের এই তালিকায় এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উঠে এসেছে৷ দ্বিতীয় সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি৷ তালিকায় চীনের ৭২টি, ভারতের ৪৯টি, তাইওয়ানের ৩২টি, পাকিস্তানের ৯টি এবং হংকংয়ের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে৷ এমনকি নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে এই তালিকায়৷ শুধু নেই বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম৷

কিন্তু বাংলাদেশে এখন ৪৩টি পাবলিক এবং ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে৷ এর বাইরে আরো ৪টি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আছে৷ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে এখন বিশ্বদ্যিালয়ের সংখ্যা ১৫০টি৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মান এবং তালিকা নিয়ে বাংলাদেশে নানা ধরনের বিতর্কও আছে৷ তবে বিতর্ক যা-ই থাক, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের যে অবনতি হয়েছে তা নিয়ে কারোই তেমন দ্বিমত নেই৷ প্রশ্ন উঠেছে মান কে নিয়ন্ত্রণ করবেন, ছাত্র, নাকি শিক্ষক? শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান অবশ্যই খারাপ৷ এটা শুধু এবার নয়৷ প্রতিবারই যখন বিশ্বের বা এশিয়ার র‌্যাংকিং করা হয়, তখনই এটা ধরা পড়ে৷ সাংহাই বিশ্ববিদ্যালয় একটা র‌্যাংকিং করে, সেটাও ভালো৷ কিন্তু কোনো র‌্যাংকিংয়েই আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পায় না৷ আমরা পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল দেশ৷ পৃথিবীর এক হাজার ভাগের ২৪ ভাগ মানুষ এখানে বাস করে৷ এই জনবহুল দেশটির কোনো বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না, এটাতো আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়৷’’

অধঃপতনের কারণ কী?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই করুণ অবস্থার কারণ জানতে চাইলে বিশ্লেষকরা যা বলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব৷ তারপর যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তা হলো: গবেষণা, অবকাঠামো, বাজেট, যোগ্য শিক্ষক এবং ছাত্র শিক্ষক অনুপাত প্রভৃতি৷

ড. কায়কোবাদ বলেন, ‘‘মানের এই অবনমনের জন্য প্রধানত দায়ী শিক্ষকরা৷ শিক্ষা নেতৃত্বের সংকট৷ এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে হলে রাজনীতিবিদদের পিছনে ঘুরতে হয়৷ শিক্ষকরা পড়াবেন বা গবেষণা করবেন কখন? তারা তো রাজনীতিবিদদের পিছনে ঘুরেই সময় শেষ করে দেন৷ এখানে শিক্ষাবিদ হয়ে লাভ নেই৷ রাজনীতি করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পদ পাওয়া যায়৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের মান কেমন, তা সহজেই বোঝা যায়৷ আমাদের ১০ উপাচার্য এবং ভারতের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নাম লিখে গুগলে সার্চ দিন, তাহলে বুঝতে পারবেন বাস্তব অবস্থা৷

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগে কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতেন, এখন আসেন না৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইআর)-এর অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘‘জাতীয় রাজনীতির কালো ছায়া পড়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে৷ এখানে শিক্ষক হতে গেলে, বিভাগের চেয়াম্যান বা অনুষদের ডীন হতে হলে, ভিসি হতে হলে রাজনৈতিক লবিং লাগে৷ যেসব শিক্ষক রাজনৈকি কারণে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা শিক্ষার মান খারাপ করছেন৷ আর যতদিন থাকবেন. মান খারাপ করেই যাবেন৷’’

তিনি বলেন, ‘‘একটা অসুস্থ অবস্থা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে৷ শিক্ষার্থীদের হলে থাকতে হলে, সিট পেতে হলে রাজনৈতিক সমর্থন লাগে৷ তাঁরা গণরুমে থাকতে বাধ্য হন৷ এই অবস্থায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে আসবে কিভাবে?’’

বাজেট পর্যাপ্ত নয়

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘‘বাজেট একটি বড় বিষয়৷ আমাদের এখানে শিক্ষায় বরাদ্দ কম৷ ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত আদর্শ পর্যায়ে নেই৷ অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, গবেষনা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ কম৷ আর হলের খাবারের মান, থাকার মান যদি খারাপ হয়, শিক্ষার মানও খারাপ হবে৷ নেপাল, ভুটানেও আমাদেরে দেশের চেয়ে শিক্ষায় বরাদ্দ বেশি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের যে বাজেট, তা আমাদের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ বছরের বাজেটের চেয়েও বেশি৷’’

সরকারি চাকরিজীবী তৈরির কারখানা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার মান খুব খারপ৷ গবেষণাও খুব কম হয়৷ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিচিং ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হয়েছে৷ শুধু পড়াচ্ছে৷ টার্গেট হলো শুধু বিসিএস৷ সরকারি চাকরি করবে৷ বিশ্ববিদ্যালয় কি সরকারি চাকরিজীবী বানাবার কারখানা? এটা কি ট্রেনিং সেন্টার? বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের সন্নিবেশ করার জায়গা৷ সেটা কিন্তু হচ্ছে না৷ সেটা কিন্তু আমরা পাচ্ছি না৷ এখানে গবেষণা হয় না৷ এখানে হয় রাজনৈতিক দলাদলি৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘গবেষণা করার তো ইচ্ছা থাকতে হবে৷ মন থাকতে হবে৷ তাই তো নেই৷ ফান্ডের কথা তো পরে আসবে৷’’

আর ড. কায়কোবাদ বলেন, ‘‘এখানে একজন শিক্ষাবিদ গুরুত্ব পায় না৷ শিক্ষকদের অনেকেই গবেষণা করতে চান না৷ তাঁরা পদ-পদবির দৌড়ে থাকেন৷ গবেষণার জন্য ফান্ড নেই, ফান্ড বরাদ্দ করেন৷ গবেষণা থাকলে তো ফান্ড বরাদ্দ হবে?’’

তিনি বলেল, ‘‘আমরা শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে পারছি না৷ ভালো শিক্ষক হলে ভালো ছাত্র তৈরি হবে৷ আমরা তো এখন জিপিএ ৫ নিয়ে উচ্ছ্বসিত৷ নিজেরা নিজেদের প্রশংসা করলে তো হবে না৷ আমাদের শিক্ষাকে বিশ্ব কিভাবে দেখে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে৷’’

র‌্যাংকিং নিয়ে প্রশ্ন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান এশিয়ার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ তিনি মনে করেন, ‘‘এখানে যেসব তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে র‌্যাংকিং করা হয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত ছিল না৷ তারা নিতে পারেনি বা আমরা দিতে পারিনি৷ আর যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে র‌্যাংকিং করা হয়েছে, তা-ও যথার্থ নয় বলে আমি মনে করি৷ একটি বিশ্ববিদ্যালয় সেই দেশের সমাজ বা রাষ্ট্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তা বিবেচনা করা হয়নি৷ এটা বিবেচনায় নেয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান অনেক উপরে হতো৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের গবেষণায় বরাদ্দের যে হিসাব দেয়া হয়েছে তা-ও ঠিক নয়৷ বাস্তবে আরো অনেক বেশি গবেষণা হয় এখানে৷ তারা শুধু সরকারি বরাদ্দের হিসাব করেছে৷ কিন্তু এখানে বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে আরো অনেক গবেষণা হয় তার হিসাব করা প্রয়োজন৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান৷ শুধু তাই নয়, আমাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গবেষণা করছেন৷ তাঁদের গবেষণা নন্দিত হচ্ছে৷’’

শিক্ষকদের মানের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘এ বছর ৩৫ জন শিক্ষক বঙ্গবন্ধু স্কলারশিপের আওতায় বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছি৷ যাঁরা ফিরে আসছেন, তাঁদের গবেষণা ও প্রকাশনা আন্তর্জাতিক মানের৷ তাঁরা মেধার ভিত্তিতেই সেখানে গেছেন৷’’

আর শিক্ষার মানের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নতি হয়েছে৷ আমরা শিক্ষার মান নিয়ে কনফিডেন্ট৷”

তাঁর মতে, র‌্যাংকিংয় এই বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উঁচুতেই থাকবে৷

Print Friendly, PDF & Email

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
জাতীয় বিভাগের সর্বশেষ
ওপরে