১৪ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ২৯শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

samakalnew24
samakalnew24
শিরোনাম:
মা’দক ব্যবসায়ীদের হামলায় র‌্যাব সদস্য আহত,গাঁ’জাসহ... ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্থদের ডিসি মামুনুর রশিদের... ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকালো... নওগাঁয় বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে দোল খাচ্ছে চিনি আপত ধানের... উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

স্বাধীনতার নিপুণ রূপকার স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

 অনলাইন ডেস্ক সমকালনিউজ২৪

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় অখ্যাত ছোট্ট গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। সেই গ্রামেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিল এক শিশু। বাবা শেখ লুত্ফুর রহমান ও মা শেখ সায়েরা খাতুন আদর করে ডাকতেন খোকা বলে।

সেই ছোট্ট গ্রামের ছোট্ট খোকাই একদিন তার নিজ মেধা, কর্মদক্ষতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু মুজিবের নেতৃত্বের বড় সার্থকতা বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তায় সমৃদ্ধ করা।

বিখ্যাত লেখক গ্যারি উইলস ১৯৯৪ সালে ‘দি আটলান্টিক মান্থলি’ পত্রিকায় ‘হোয়াট মেকস এ গুড লিডার’ প্রবন্ধে বলছেন, নেতৃত্বের যে বৃত্ত তার উপাদান ৩টি : খবধফবত্, ঋড়ষষড়বিত্ং ড়েধষং নেতার প্রয়োজনীয় গুণাবলী হলো- ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী ক্ষমতা, জনগণের সামনে স্পষ্ট এমন একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যম ও উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয়ার মতো নেতার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।

এমন গুণাবলী সমৃদ্ধ নেতাকে প্রায়শ ‘কারিশমা’ সম্পন্ন নেতাও বলা হয়। একজন নেতা তখনই তার অনুসারিদের জন্য সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন যখন তিনি ত্রিকালদর্শী হন। অর্থাত্ নেতা অতীত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, বর্তমানকে অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যত্ দ্রষ্টা হতে পারেন।

বঙ্গবন্ধু সংগ্রামী নেতৃত্বের মধ্যে উল্লিখিত সব উপাদান পরিলক্ষিত হয়। তার নেতৃত্বের দুটো পর্ব আছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ১ম পর্ব এবং ২য় পর্ব স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭২-৭৫)। ১ম পর্বে ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। আর ২য় পর্বে ছিল অত্যন্ত কঠিন ও বৈরী পরিস্থিতিতে দেশ গড়ার সংগ্রাম। যদিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু মুজিবের বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভে শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানিসহ

অনেকের নাম স্মরণীয়। এদের কাছে বঙ্গবন্ধুরও ঋণ ছিল অপরিসীম। তবে অনস্বীকার্য যে, চূড়ান্ত মুহুর্তে বাঙালি জাতির নেতৃত্বের কর্ণধার ছিলেন শেখ মুজিবই। আর সে কারণেই তিনি মুজিব থেকে মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু, জাতির জনকের পদ অলংকৃত করেছিলেন। রাজনৈতিক ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার নিপুণ রূপকার স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

পল্লীকবি জসিম উদ্দিন তার বিখ্যাত কবিতায় মুজিবের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে বলেছেন, ‘রাজ ভয় আর কারা শৃঙ্খল হেলায় করেছে জয়/ফাঁসির মঞ্চে মহত্ত্ব তব তখনও হয়নি ক্ষয়। বাংলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমূর্ত রাজ/প্রতি বাঙালির হূদয়ে হূদয়ে তোমার তক্ত তাজ।’

মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ২৫ মার্চ ৭১ হানাদার পাকিস্তানিরা তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেলে এ মুজিবের নামেই বাংলার মুক্তি পাগল বীর সন্তানেরা ৯টি মাস দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ তারই দিক নির্দেশনায় এবং নামে পরিচালিত হয়। তিনিই প্রথম বাঙালি সরকার প্রধান যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন।

বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা পালন করায় এবং এর ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মুজিব বাঙালি জাতির ইতিহাসে ‘জাতির পিতা’ রূপে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ও প্রাণপ্রদীপ।

দেশের উপকূলীয় এলাকায় যেখানে বার বার প্রচণ্ড বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিপুল সংখ্যক জীবন ও সম্পদহানি হচ্ছে, সে বিষয়টি চিন্তা করেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্নিমাণে তার আন্তরিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শিগগিরই দেশের উপকূলীয় অংশে ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।

বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সহায়তায় উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে ‘মুজিব কেল্লা’ নামে পরিচিত উঁচু মাটির টিলা (আশ্রয় কেন্দ্র) স্থাপন করেছেন। যেখানে মানুষ নিজেরা ও তাদের গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে আশ্রয় নিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) প্রণয়ন এবং চালু করা বঙ্গবন্ধুর একটি সাহসী ও অবিস্মরণীয় উদ্যোগ ছিল। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গৃহিত এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল, যা এখনও মাইলফলক হয়ে আছে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে কর্পদকহীন হাতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠিত করা, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাসহ এক কোটি ভারত প্রত্যাগত বাঙালি শরণার্থীর পুনর্বাসিত করে যখন ২য় বিপ্লবের কর্মসূচির ডাক দিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিশ্বের দরবারে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নেয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই ৭৫এর ১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের ইশারায় বিশ্বাসঘাতক স্বাধীনতাবিরোধী কতিপয় সেনা কর্মকর্তার হাতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। আবারও একবার বাংলার মাটিতে রচিত হলো বেইমানির নির্লজ্জ ইতিহাস।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার সঙ্গে ক্ষমতার লোভে নবাব হওয়ার আশায় বেইমানি করেছিল তারই সেনাপতি ও পরম আত্মীয় মীর জাফর আলী খান। ১৯৭৫ সালে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটালো রাষ্ট্রপতি হওয়ার খায়েশে মুজিবের রাজনৈতিক সহচর, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্য কুমিল্লার খন্দকার মোশতাক।

উভয়ের পরিণতি বাংলার মানুষ দেখেছে। হত্যাকারীর আত্মীয়-স্বজনও আজ তাদের স্মরণও করে না। উভয়ের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিল স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। স্বাভাবিক মৃত্যু ও দাফন তাদের ভাগ্যেও জোটেনি। তাদের উভয়ের সাঙ্গপাঙ্গরা আমৃত্যু পলাতক ও নিন্দিত জীবন যাপন করেছেন। অধিকাংশ সাঙ্গপাঙ্গ লাভ করেছে অভিশপ্ত মৃত্যুর স্বাদ।

পক্ষান্তরে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরকাল বেঁচে থাকবেন ৫৫ হাজার বর্গমাইলের সবুজ শ্যামল এ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মাটি ও মানুষের হূদয়ে। বাংলাদেশের মতোই শাশ্বত চিরায়ত ও দেদীপ্যমান বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার সব দূরভিসন্ধি আজ দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আজ মানুষ বুঝতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে বাংলাদেশের নাম মুছে ফেলতে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। কিন্তু তাদের সেই বিশ্বাসঘাতকতা, উচ্চাভিলাষী ধ্যানধারণা বাস্তব রূপ লাভ করেনি। বাংলাদেশকে মুছে ফেলতে না পারলে কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকেও মুছে ফেলতে পারবে না।

কবি অন্নদা শঙ্কর রায় বলেছেন, ‘যতোদিন রবে পদ্মা, মেঘনা/গৌরি যমুনা বহমান/ততোদিন রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক: নাট্যকার, প্রবন্ধকার ও সংগঠক, সভাপতি বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ইমেইল থেকে
ওপরে